Sharing is caring!

কাঠগোলাপের পাঁচকাহন

কাঠগোলাপের পাঁচকাহন

(১) যখন কাঠগোলাপের সাথে আমার প্রথম দেখা! বিশাল এক গাছ থেকে বৃষ্টির ঝড়ো হাওয়ায় টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিলো ওরা। ভেতরের কাঁচাসোনা রঙ আর বাহিরের শুভ্রতা ধুলোকাদায় মাখামাখি হচ্ছিলো অযথাই। প্রাণপণে দৌড়ে গেলাম দেখামাত্রই। ভিজলাম তবুও নিষ্কলঙ্কে দাগ লাগতে দেইনি। ওরা যে বড্ড কোমল!ত্বরিৎ পায়ে ঝটপট তুলতে লাগলাম এক রাশ স্বর্ণফুল। কি আজব! কি সুন্দর! কি অদ্ভুত আদুরে! এর যে ঘ্রাণও আছে! বোনাস! ফুলগুলোকে আঁচলে নিয়ে ফিরলাম বারান্দায়, বৃষ্টির স্বচ্ছ পানিতে গোসল করিয়ে নিলাম। কাছে নিয়ে ঘ্রাণ শুঁকলাম। আর কি যে মায়াময় সে ফুলের রঙ, পাপড়ির নিজস্বতা, কোমলতা! পারিজাত বুঝি এমনই হয়! ঘরের ভেতর এ ফুলের মেহমানদারি এবার! পাত্র ভর্তি পানি নিয়ে ভাসিয়ে দিলাম একরাশ সোনালি শুভ্রতাকে। স্বর্ণ আহরিকরা যদি খোঁজ পেতো এ খনির! আর কোনোদিন হাতুড়ি শাবল নিয়ে বেরুতো না, অবিরাম খুঁড়ে চলতোনা কঠিন মাটি! এ ঘর থেকে ও ঘরে ঘুরে ফিরে আবার এ ঘরে আসি ঠিক যেমন মা পাখি ফিরে ফিরে যায়, থেকে থেকে চায় তার ছানাদের দিকে। এক দু ফোঁটা আহারের মত পানি ছিঁটিয়ে দেই ওদের গায়ে। ওরা হাসে যেন। ওদের পাপড়িতে পানির বিন্দুগুলো যেন শিশুর মুখের খুশির ঝিলিক। পানি টা নেড়ে দেই, সে ঢেউয়ে ওরা দোলনা চড়া শুভ্র শিশু। কি আদর! কি মায়া! চোখে লেগে আছে এখনো। থাকবে আজীবন।
(২) এবার পারিজাতের খোঁজে সারাবেলা সারাক্ষন। কোথায় পাবো বলো কোথায় গিয়ে! নামটাও জানিনা তখন। ভালোবাসতাম শুধুই অজানা সে সুবাসিত শুভ্র মায়া কে। কত নার্সারিতে খুঁজলাম। নাম জানিনা কিভাবে পাই! একদিন একটা ছোট ডাল দেখলাম এক ভ্যান এ। এক দুটা পাতা সে ডালে। দেখতে ঠিক আমার সে স্বর্ণফুলের পাতার মতই। আনন্দে আত্মহারা আমি! কি নাম এ ফুলগাছের! “চাঁপা ফুল” গাছমালিকের ভুল উত্তরই সই তখন। কিনে নিলাম টাকার দরে সে মহামুল্যকে। টবে অতি আদরে থাকতে লাগলো সে দুই পাতাওয়ালা একটি ডাল। একদিন যায় দুইদিন যায়। পাতার সংখ্যা বাড়ে। আর আমার মনের আশা উচ্চাশায় রুপ নিতে থাকে। একদিন সকালে হঠাৎ, এলো আমার ঈদের দিন! আমার আকাশের ঈদের চাঁদের মত ফুটে উঠলো একটা কাঠগোলাপ যাকে আমি ভাবছিলাম স্বর্ণচাঁপা। এ যেন এক পাখির বাসায় আরেক পাখির ডিম। আরো কয়টা পাখির ডিম আছে। মানে ফুলের কলি। আমি অপেক্ষা করি কখন বাকিরাও ফুটে উঠবে,হাসবে আমার হয়ে! স্বর্গের ফুল কি এমনি! আমি জানিনাতো! কেউ জানেনা! তবে আমি এর এক ফোঁটা দেখি। কি ছোট্ট! কি মায়া! কি সুবাস! কি মিষ্টি! কি আদর! কি আদর! পাঁচজনের যখন একটা থোকা হল আমি তখন ঘুরে ফিরে আসি। আবার দেখি। ফিরে আবার আসি। আবার দেখে যাই। স্বর্গীয় শিশু যেনো। মন ভরেনা দেখে। যদি থাকতো আজীবন! আমার চে সুখী কেউ হতোনা তাহলে! এক ঝাঁক চড়ুই আর শালিক আসতো তখন। ওদের সাথে বন্ধুত্বের লোভেই হয়তো! সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিলাম! ওরা যে আমার নিজের ছিলো! একদম নিজস্ব। তারপর মহাকালের নিয়মে ওরা চলে গেলো,শুকিয়ে ঝরে গেলো, ফুলগুলোর সাথে গাছটাও নিষ্প্রাণ হয়ে গেলো আচমকাই! আমাকে সবার মাঝে রেখে ফিরে গেলো যে স্বর্গ থেকে এসেছিলো। সে চড়ুই আর শালিকের ভিড়ে!
(৩) তখনো ইন্টারনেট আমার হাতে পৌঁছায়নি। ওদের চিনতে দেরি হয়েছিলো তাই। অনেক কে জিজ্ঞেস করেছিলাম এ ফুলের নাম। একদিন জানলাম এটা কাঠগোলাপ। বিশ্বাস করলামনা। স্বর্ণের মত আর সাদা পাখির পালকের মত এ ফুলের নাম কাঠ দিয়ে কিভাবে শুরু হয়! নিশ্চয়ই ভুল! কিন্তু সত্য টা একদম ভিন্ন। আমার ভাবনার উল্টা। এ নামটাই সঠিক।
ফুলের সঠিক নামের সাথে সাথে সঠিক মানুষটাও এলো আমার জীবনে। আলহামদুলিল্লাহ। কিছুদিন পর ইন্টারনেটে খুঁজে পেলাম কাঠগোলাপ। আসল রুপে, আসল নামে। আর কোনো দ্বিধা নেই, সারা দুনিয়া আমাকে চেনাতে সাহায্য করলো,নিয়ে গেলো আমার প্রিয় ফুলের কাছে। সিনেমার ওই কথাটার মতো -“আগার কই চিজ তুম দিল সে চাহো তো পুরি কায়নাত তুমহে ভো চিজ দিলানেকি কোশিশ মে লাগ যায়েগি।” আমি চাইলেই এখন তাকে পেতে পারি নাম ধরে ডেকে। যদিও অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে,অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, ভাবনার পাহাড় আর বাকবিতণ্ডা পেরিয়ে। তবুও তো পেলাম। ঠিক সত্যমানবের মতই। ওকেও তো পেলাম। অনেক সময় পেরিয়ে।
(৪) শাটল দিয়ে যখন বিবিরহাট পার হতাম তখন চেয়ে থাকতাম থোকা থোকা ফুল সহ কাঠগোলাপ গাছটা কখন দেখবো। ট্রেন থামতোনা তখন। ট্রেন এর জানালার পাশ থেকে দেখতাম প্রাকৃতিক ফুলদানি টাকে। কি সুন্দর অদ্ভুত ভালোবাসায় পরিপুর্ণ সে চিত্রপট। আমি চাইতাম ট্রেন আর না যাক। হঠাৎ করে কি থেমে যেতে পারেনা! কান্না পায় ওদের ছেড়ে যেতে। সুখ দুঃখের মিশ্র অনুভুতি তখন। ওদের এক পলক দেখতে পাওয়ার সুখ আর একই সাথে ছেড়ে যাওয়ার দুখ। ওরা তো জানার আগেই ঝরে পড়ে লাগোয়া পুকুরটাতে যে প্রতিদিন কেউ একজন ওদের জন্য এতো অনুভুতি নিয়ে পেরিয়ে জায় এ পথ। ভালোবেসে হৃদয় নিঙড়ানো প্রেম আর আদর রেখে যায় ওদের জন্য সে বাতাসের কাছে। নগরীর যে প্রান্তে আমার ঘর তার থেকে অনেক দুরে বিপরীত প্রান্তে অনেক গুলো বাড়ির সামনে আমার টুকরা টুকরা সুখের এ ফুলগুলি দেখি। ওদের মিষ্টি হেসে কুশল জানাতে ভুলিনা। অতটা খারাপ লাগেনা অবশ্য। জানি, বড় বাড়ির আঙিনায় ওরা ভালই থাকে আর আমায় দেখে মুচকি হাসার অপেক্ষায় থাকে শুধু। রাস্তার পাশে একটার পর একটা দুইটা কাঠগোলাপ গাছ। সেগুলা বাবার বাড়ির দেশে। বার বার দেখি। একদিন ঝোঁকের মাথায় নেমেই পড়লাম। কাছে গেলাম, ছুঁয়ে দেখলাম। এই বা কম কি! কাঠগোলাপের জন্য সব পারি আমি। এর আগে একদিন এক বাড়িতে ঢুকে পড়লাম কাঠগোলাপের টানে। নিচে পড়ে থাকা স্বর্ণ রঙা সাদা পায়রা ফুল কুড়িয়ে নিলাম দু হাত ভরে। ব্যাগ এ ছিলো অনেকদিন।

Image may contain: flower, plant and nature
(৫) একদিন ভীষণ মন খারাপের দিন, যখন নিজেকেও ভালোবাসতে ব্যার্থ হচ্ছিলাম বারবার। সেদিন কাঠগোলাপের বাচ্চা গাছটাকে আমার সাথে নিয়ে এসেছিলাম। দুঃখ ভুলতে। এত ভালোবাসি তারপরও কাছে এনে রাখিনি এতদিন। প্রথম গাছটার শোক যে ভুলতে পারিনি তখনও! প্রথমটার এত কাছ থেকে চলে যাওয়ার স্মৃতি প্রথম প্রেম দরজা থেকে চলে যাওয়ার মতই। নতুন গাছটা পাতা দিয়েছে অনেক।

Monira Pritu
Dept of English

Sharing is caring!

culiveগল্পমতামতগল্প,বৃক্ষকাঠগোলাপের পাঁচকাহন (১) যখন কাঠগোলাপের সাথে আমার প্রথম দেখা! বিশাল এক গাছ থেকে বৃষ্টির ঝড়ো হাওয়ায় টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিলো ওরা। ভেতরের কাঁচাসোনা রঙ আর বাহিরের শুভ্রতা ধুলোকাদায় মাখামাখি হচ্ছিলো অযথাই। প্রাণপণে দৌড়ে গেলাম দেখামাত্রই। ভিজলাম তবুও নিষ্কলঙ্কে দাগ লাগতে দেইনি। ওরা যে বড্ড কোমল!ত্বরিৎ পায়ে ঝটপট তুলতে লাগলাম এক...#1 News portal of Chittagong University