Sharing is caring!

কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই আলজাজিরা পরিবেশিত সংবাদ এবং নানা অনুষ্ঠান আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অশংবৃত বিতর্ক ও ক্ষোভ সঞ্চারণে উৎত্রাসি গণমাধ্যমে পরিণত হয়। অনেকের মতে মিসরের হোসনী মোবারকের পতন, আরব বসন্ত ও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মোরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আলজাজিরার নিকৃষ্ট মদদই চিহ্নিত হয়েছে। কুৎসিত অপসাংবাদিকতা এবং অসত্য প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রমূলক অসহিষ্ণু সন্ত্রাস সংঘটনে আলজাজিরা চরম অগ্রহণযোগ্য গণমাধ্যমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কালক্রমে এই গণমাধ্যম সাবলীল ও স্বাভাবিক রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা-অন্তরায় সৃষ্টি, দেশকে অস্থিতিশীল করা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিরোধ-বিচ্ছেদ-সংঘাত-সংঘর্ষে উৎসাহিত করে সন্ত্রাসী-জঙ্গী-দুর্বৃত্তায়নের রসদ যোগানে পারঙ্গম শক্তিতে পরিণত হয়। ২০১৭ সালে মে মাসের শেষ নাগাদ সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইন আলজাজিরার ওয়েবসাইট ব্লক ও ৫ জুন এসব দেশ জঙ্গীবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। অধিকন্তু সৌদি আরব আলজাজিরার কার্যালয় বন্ধ, লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন করার অভিযোগ আনে।

২০০২ সালে আলজাজিরায় সৌদি আরবের ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি পরিকল্পনার অগ্রাধিকার সংবাদ পরিবেশনে ক্ষুব্ধ হয়ে কাতার থেকে রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে আনে সৌদি আরব। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রদূতকে ফেরত পাঠানো হলেও ২০১৪ সালে কূটনৈতিক বিবাদে সৌদি আরব, আবর আমিরাত ও বাহরাইন রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন হাজারের অধিক সংবাদকর্মীর সহযোগিতায় পরিচালিত আলজাজিরা বেশ কয়েক বছর ধরে ‘শরিয়া ও জীবন’ নামক অনুষ্ঠানটি প্রচার করে বৃহত্তর আরব জনগোষ্ঠীর মনমানসিকতায় এক ধরনের প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের আধ্যাত্মিক নেতা ইউসুফ আল-কারাদাবিকে দর্শকের সম্মুখীন করে বিচিত্র আত্মঘাতী বোমা হামলা, জিহাদের বিকৃত ব্যাখ্যা, নারী হিজাব পরিধানসহ ইয়াজিদী নারী ধর্ষণ সম্পর্কিত বিপুল অসংলগ্ন বিতর্কিত মতামত বিনিময়ের ব্যবস্থা এই গণমাধ্যম অনেকের কাছে কৌতূহল সন্তাপ করে। অনেক রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের বিরোধী পক্ষকে সমর্থন এবং নানা দেশবিরোধী কার্যক্রমকে প্রণোদিত করার অভিযোগে আলজাজিরাকে অভিযুক্ত করে।

উল্লেখ্য যে, সৌদি আরব, মিসর ও জর্দানসহ আরও কয়েকটি দেশ চ্যানেলটির ব্যুরো অফিস শুধু বন্ধই করেনি, চ্যানেলটির কাছে হোটেল ভাড়া দেয়া নিষিদ্ধ করে। এই চ্যানেলটি বন্ধ করার জন্য কাতারের ওপর অন্য আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগ এবং কূটনৈতিক যুদ্ধ থামানোর পূর্বশর্ত হিসেবে এই চ্যানেল বন্ধের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে। আলজাজিরা চ্যানেল বন্ধ, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের সীমারেখা নির্ণয়, তুর্কির সামরিক ঘাঁটি বন্ধ ও অন্য আরব দেশে নিষিদ্ধ সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্কে বিলোপসহ তেরটি শর্তে প্রতিবেশী দেশগুলো কাতারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ঐকমত্যে পৌঁছে। বিশ্বের সচেতন মহল সম্যক অবগত আছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে আরব ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় পঁয়ত্রিশ কোটি এবং ১৯৫০ ও ৬০’র দশকে বেতার কেন্দ্রগুলো স্থাপনের মাধ্যমে বিশেষ করে ১৯৯০’র দশকে সৌদি রাজপরিবার আরবি ভাষায় বিভিন্ন সংবাদপত্র সংগ্রহ ও তা সমগ্র অঞ্চলে বিতরণের ব্যবস্থা করে।

সৌদি আরবের এই ধরনের গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় আলজাজিরার মতো গণমাধ্যমের আবির্ভাব সমগ্র বিশ্বে বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের আপামর জনগণের মধ্যে ইতিবাচক আলোড়ন সৃষ্টি করে। আরব গণমাধ্যম নিয়ে খ্যাতিমান লেখক শিবলি তেলহামির মতে, ‘এটি কাতারের আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানিকে আলজাজিরা প্রতিষ্ঠায় ও ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু থেকে এই নেটওয়ার্কের পিছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করতে অনুপ্রাণিত করে।’ অনেকেই এই ধারণা পোষণ করেন শেখ থানি সৌদি মালিকানাধীন সংবাদপত্রে তার বিরুদ্ধে সমালোচনার প্রতি-উত্তরে এই চ্যানেলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসরাইলী সেনা ও আন্দোলনরত ফিলিস্তিনীদের বিভিন্ন সংঘর্ষ সরাসরি সম্প্রচার, ওসামা বিন লাদেনের ভিডিও বার্তা প্রচার এবং আরব বিশ্বের জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গণমতামত প্রচারের কথিত প্লাটফর্ম তৈরি করার লক্ষ্যেই এই গণমাধ্যমের কর্মযজ্ঞ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পরিলক্ষিত হয়। ২০০১ সালের দিকে প্রায় ৭৫ শতাংশ আরব নাগরিকের প্রিয় চ্যানেলের তালিকার প্রথম দিকে থাকা সত্ত্বেও স্বল্প সময়ের মধ্যে এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার প্রকৃত রহস্য এবং উদ্দেশ্য উন্মোচিত হয়। ফলশ্রুতিতে এই গণমাধ্যম উপস্থাপিত সংবাদ বা অন্য বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা নেতিবাচক নিষেবণে পর্যবসিত হয়।

২০১৪ সালের ১০ নবেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, আলজাজিরা গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করে আসছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আলজাজিরার ধারাবাহিক নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই ছিল তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষ অবলম্বন করে আলজাজিরার প্রচারিত দৃষ্টিভঙ্গি মূলত এই বিচার কার্যক্রমকে স্তব্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলকে প্রভাবিত এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করার দূরভিসন্ধি এজেন্ডায় পরিণত হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন ঘটনা নিয়েও আলজাজিরা নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সুস্পষ্ট বিগর্হণ অস্থিরতা তৈরিতে পরিবেশিত কথিত বিচ্যুত সংবাদ পরিবেশন বা ২০১১ সালের জানুয়ারিতে র্যা ব কর্তৃক সাভারের একটি ইটভাঁটি থেকে শিশু ও নারীসহ শিকলবন্দী ৩০ জনকে উদ্ধার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের অসত্য সংবাদ, যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা এবং কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ‘বাংলাদেশ পার্টি চিফ টু হ্যাং ফর ওয়ার ক্রাইমস’ শিরোনামে প্রচারিত সংবাদে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ মারা যায় মর্মে বিকৃত সংবাদ পরিবেশন, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজত ইসলামের শাপলা চত্বরের ঘটনায় সাধারণ করবস্থানের ভিডিও ও বাক প্রতিবন্ধী শ্রমিকের ছবি ব্যবহার করে হাজার হাজার লাশ দাফনের দাবি, রোহিঙ্গা ইস্যু, নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলন নিয়ে লাগাতার মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন উল্লেখযোগ্য।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আলজাজিরা কর্তৃপক্ষের অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সংবাদ মাধ্যমটি থেকে মিসর শাখার প্রায় ২২ জন সাংবাদিকসহ সম্পাদকীয় বোর্ড থেকে ৪ জনের পদত্যাগ বিশ্ব গণমাধ্যম জগতে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০১০ সালে কুয়েত সরকার বিরোধী দলের সমাবেশে পুলিশী হামলার চিত্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচারের কারণে আলজাজিরার কার্যালয় বন্ধ করে দেয়। ২০১৪ সালে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন ও মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থনের অভিযোগ প্রমাণে মিসর উক্ত সংস্থার তিন সাংবাদিককে সাত বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে এবং একই বছর জানুয়ারি মাসে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বিরাজ করছে মর্মে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ২০ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। কাতার রাজপরিবারের সদস্য ও আলজাজিরার স্বত্বাধিকারীর একজন আল করিম আল সানির আল কায়েদাকে এক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা এবং আলজাজিরা কর্তৃক আইএসকে ১.৫ মিলিয়ন পাউন্ড দেয়ার কথা বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বহুল প্রচারিত হয়।

সংস্কৃতির বস্তু ও অবস্তুগত প্রবাহের জটিল মিথস্ক্রিয়ায় সততা-নৈতিকতা-সত্যবাদিতা-শুদ্ধাচার আপেক্ষিক পরিশুদ্ধ সমাজে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত। অসংখ্য পরিকল্পনায় একদিকে নির্মিত হয়েছে আগ্রাসনবৃত্ত, অন্যদিকে পর্যুদস্ত ঐতিহ্য-কৃষ্টির ভৈরবী। বৃহত্তর সমাজের বৈষম্যের বিরাজিত যুগপৎ সঙ্কট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদকেই পক্ষান্তরে উন্মোচিত করেছে নির্ভরশীলতার নতুন কদর্য দিগন্ত। সুশাসন বা সততা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার যৌগিক গতিময়তা বৃহত্তর পরিসরে এক ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যাহ্নিক বলয় অতিক্রম করছে। সৎ-যোগ্য-মেধাবী-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন যেন সমাজে অবমূল্যায়নের তলানিতে এসে ঠেকেছে। বড়ই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত আলোকময় এই জগৎ। পরিবর্তিত এহেন পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ট-সত্যনিষ্ঠতা চর্চার তাৎপর্য অতীব জরুরী। সত্যমানস, জ্ঞানঐশ্বর্যের প্রবুদ্ধ ধারক-বাহক এখনও বৈদগ্ধ বিশ্বাসের ওপর ভর করে উপলব্ধি করতে চায়- গণমাধ্যম সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠ ব্রতী হয়ে প্রবর্তমান অনুন্নয়নের উন্নয়ন নয়, বরং গণউন্নয়নের উন্নয়ন সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখবে।

গণবিচ্যুত গণমাধ্যম অপসংস্কৃতির নষ্টধারাকে বিশ্বময়তাদানে উন্নয়নশীল বিশ্বকে কতটুকু নির্মমভাবে প্রভাবিত ও দুর্বৃত্তায়নের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারদর্শী সচেতন বিশ্বজনীন মানবতাবাদী বিবেকবান মানুষের বোধে তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। প্রসঙ্গত মহাত্মা গান্ধীর অমীয় মন্তব্য উল্লেখ করতে চাই – ‘আমি আমার ঘরটিকে চারদিকে প্রাচীরবেষ্টিত ও আমার জানালাগুলো বন্ধ রাখতে চাই না। আমি চাই সকল দেশের সংস্কৃতি আমার ঘরের চারপাশে যত ইচ্ছা স্বাধীনভাবে এসে ভিড় করুক। কিন্তু তার কোনটি আমাকে স্থানচ্যুত করবে সেটা আমি হতে দেব না।’ প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতা, ভাবাদর্শ, মূল্যবোধ, জ্ঞান আহরণ-বিতরণ ও সৃজনের প্রতীকী প্রকৃতি-প্রবাহ এবং পরিকর্ষ মানদণ্ডে এর প্রায়োগিক বিনিময় আজকের দিনে গান্ধীজীর অমূল্য মন্তব্য কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ তা বিবেচনার দাবি রাখে। বস্তুতপক্ষে গণমাধ্যম বিশেষ করে সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ, স্যাটেলাইট সংস্করণ, ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাকার ক্রমবর্ধমান উপকরণসমূহ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে কতটুকু জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে- তা নিয়ে সমুদিত সংশয় অত্যধিক প্রবল।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে অতি স্বল্পসংখ্যক গণমাধ্যম এবং গুটিকয়েক ব্যক্তি সাংবাদিক মুখোশধারী অপসাংবাদিকতায় লিপ্ত থেকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চরিত্রহনন, সরকারী-বেসরকারী সংস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নানাবিধ অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিহিংসা-বিদ্বেষমূলক-প্রতিশোধপরায়ণ হয়রানির নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে ব্যতিব্যস্ত থাকে। হিংস্র বন্যপশুর রক্তপ্রবাহে যেন এদের জন্মরহস্য নির্ধারিত। অপরিমেয় অর্থ-ক্ষমতা-প্রভাবলিপ্সু মেধাশূন্য ও অযোগ্যতায় প্রতনু অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী পদ-পদক-পদবী আদায়ে নির্লজ্জ ছলচাতুরী-প্রতারণায় অভ্যস্ত ঘৃণ্য-নপুংসক দল এসব কথিত কবি-সাংবাদিক-কলামিস্ট-প্রাবন্ধিকগোষ্ঠী প্রণোদিত এবং প্রণমিত সহায়তাপ্রাপ্ত হয়ে তাদেরই কৌশলপত্র বাস্তবায়নে পবিত্র সাংবাদিকতা-গণমাধ্যম জগতকে বিশ্বব্যাপী করছে নিদারুণ অপবিত্র ও কলুষিত। এ প্রসঙ্গে বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল প্রাইজ প্রণেতা আলফ্রেড নোবেলকে গভীর স্মরণে আসছে। তিনি পরিহাস করে নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘কোন ডাক্তারের উচিত ছিল জন্ম মুহূর্তে তাঁর শোচনীয় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানো। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ : তিনি অর্থলোলুপ ছিলেন না।’ এই কঠিন সত্যকে যারাই ধারণ করছেন তারাই প্রতিমুহূর্তে সমকক্ষতা পরাভূত ব্যক্তি-গোষ্ঠীসৃষ্ট নির্মম সঙ্কটে নিপতিত হচ্ছেন। এই বিপ্রতীপ সংশ্লেষ পুরো সমাজকেই বিপন্ন নির্বন্ধতায় আলোকনিবারিত করে তুলছে। সময়ের জোরালো দাবি- গণমাধ্যমের সত্যনিষ্ঠ লেখনী, প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, মনন-সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ তারুণ্যের অদম্য সক্ষমতার অবগাহনে এক আধুনিক যুগের ব্যাবর্তন সংস্কৃতির উৎসমূলে থাকবে এবং প্রতিটি সভ্য জাতিগোষ্ঠীতে সুশাসনের সংসর্গ প্রতিস্থাপন করবে।

নিঃসন্দেহে বলা যায়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের বাণিজ্যিকীকরণের অপকৌশল সামাজিক অসঙ্গতিগুলোকে গাঢ় করে তুলছে। বিশেষ করে পণ্য উৎপাদন, বিক্রি এবং বিতরণের পন্থা বিচিত্র এক অন্তর্দ্বন্দ্বের বিরোধ প্রক্রিয়াকে সুনিপুণভাবে সুদৃঢ় করছে। সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড রিছম্যানের মতে ঐতিহ্যিক, অন্যের মতামতনির্ভর বিবেক পরিচালিত আদর্শের ভিত্তিতে যে মনোজগৎ তৈরি হয় তা গণমাধ্যমের প্রচারিত বিজ্ঞাপন, জনমত তৈরি বা ব্যক্তিত্ব গঠনে মৌলিক ইতি পরিবর্তনের অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত এবং অস্থিতিশীল, অবাঞ্ছিত, অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে দুর্দৈব অনৈতিক কালান্তরে প্রণিহিত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে চার্লস ডিকেন্সের ভাষায় একদিকে বিশ্ব সৌভাগ্যদের সর্বোত্তম এবং অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক ভাগ্যবিরূপ জনগোষ্ঠীর বর্বরতম রূপায়ণ। তথ্যপ্রবাহের কথিত বিশ্বায়নে হেন্রি কিসিঞ্জারের বক্তব্যেও তা সুস্পষ্ট- ‘কোন ঐতিহাসিক যুগের ধারে-কাছেও যা ঘটেনি বিশ্বায়ন সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে তেমন এক বিস্ফোরণকেই উৎসাহিত করেছে। এমন দ্রুত পরিবর্তন অনিবার্যভাবেই বিদ্যমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধরনগুলোকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে। … একটি রাজনৈতিক অস্বস্তি অবশ্যম্ভাবী, বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বে। এটা হলো ব্যক্তি অথবা সরকার কারও পক্ষেই আর প্রভাবিত করা সম্ভব নয় এমনই এক শক্তির কৃপানির্ভর হয়ে পড়ার অনুভূতি।’ মূলত গণমাধ্যমে প্রযুক্তিবিদ্যার প্রায়োগিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কারণ হতে পারে। এটি স্বতঃসিদ্ধ যে, প্রাগ্রসর জীবনপ্রবাহ উন্নততর পদ্ধতি অবলম্বনে পূর্বার্জিত সকল প্রতিপত্তি-সম্পদ-সম্মানকে উপেক্ষার অনগ্রসর মনোভাবকে উৎসাহিত করে।

গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সত্য-বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় সংবাদপত্র বা সাংবাদিকদের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন রচিত হওয়ার বিষয়টি সর্বজনস্বীকৃত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট সংবাদপত্রকে জনগণের অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি এবং জনমত গঠনে সাংবাদিকদের বিবেকপ্রসূত কর্মযজ্ঞকে বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যমকে ফোর্থ এস্টেট বা চতুর্থ রাষ্ট্রসম্পদ বিশেষণে ভূষিত করে। অন্য তিনটি প্রপঞ্চ হলো ধর্মযাজক, অভিজাততন্ত্র ও সাধারণ মানুষ। এখনও বিশ্ব গুরুত্বের সঙ্গে ভৌগোলিক সীমারেখা নির্বিশেষে সকল ধরনের নষ্ট সাংবাদিকতাকে পরিহার করে সুষ্ঠু সাংবাদিকতায় পরিপুষ্ট সংবাদ মাধ্যমকে মনুষ্যত্ব-মানবিকতার সেবা-পরিচর্যার অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। চলতি মাসের ২ তারিখ আলজাজিরা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও অতীব মর্যাদাপূর্ণ দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যে সংবাদ পরিবেশন করেছে তা কোনভাবেই মার্জিত-পরিশীলিত-যথার্থ সাংবাদিকতার পরিচায়ক হতে পারে না। সচেতন মহলের মতে অশুভ অন্ধকারের ব্যতীপাত আলজাজিরার মতো অবাঞ্ছিত-অপাঙ্ক্তেয় সংবাদ সংযোগ ও একই ধরনের কতিপয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কদাচার চরিত্রের কলঙ্কিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিক নামধারীদের প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দেশের সমগ্র জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ করে দেশবাসী মনে করেন এই ধরনের বেপরোয়া, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট প্রচারণা দেশবিরোধী চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রকারীদের বর্বরতম কূটকৌশলের অপভ্রংশ ছাড়া আর কিছুই নয়। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি নরপশুতুল্য এসব ধিকৃত ও ঘৃণিত শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই ইনশাআল্লাহ।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী,

সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Sharing is caring!

culiveআন্তর্জাতিকআলজাজিরা,কদর্য অপসাংবাদিকতা,চবি ভিসিকার্যক্রম শুরুর পর থেকেই আলজাজিরা পরিবেশিত সংবাদ এবং নানা অনুষ্ঠান আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অশংবৃত বিতর্ক ও ক্ষোভ সঞ্চারণে উৎত্রাসি গণমাধ্যমে পরিণত হয়। অনেকের মতে মিসরের হোসনী মোবারকের পতন, আরব বসন্ত ও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মোরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আলজাজিরার নিকৃষ্ট মদদই চিহ্নিত হয়েছে। কুৎসিত অপসাংবাদিকতা এবং অসত্য...#1 News portal of Chittagong University