Sharing is caring!

জাতীয় সংগীতও রবীন্দ্রনাথ

 

culive24desk : জাতীয় সঙ্গীত আর রবীন্দ্রনাথ পেয়েছি কঠোর সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়

উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বাংলা দেশাত্ববোধক গানের সূচনা। ১৯০৫ এ রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়, বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাবে প্রভাব নিয়ে আসে গনসংগীত, নজরুলের হাতে যার ঝংকার উঠেছিল পূর্ণাঙ্গভাবে । পঞ্চাশের দশকে মহান ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে গন আন্দোলন ও গন অভূথান, সত্তরের দশক মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ , এসবের পিছনে প্রেরনা হিসাবে সংগীত তথা বাঙালি সংস্কৃতির অবদান ছিল অনস্বীকার্য ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সাথে সাথে দ্বিখণ্ডিত হয় তৎকালীন ভারতবর্ষ । এ সময় পাকিস্তানি শাসকদের বাংলাবিদ্বেষী মনোভাবের ফলস্বরূপ পূর্ব বাংলায় (পূর্ব পাকিস্তান) রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।
জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে বলতে গিয়ে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেছেন, ১৯৫৬ সালে ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল। পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ থেকে আসা সংসদ সদস্যদের সম্মানে কার্জন হলে আয়োজন করা হয়েছিল অনুষ্ঠানের। উদ্যোক্তা ছিলেন গণপরিষদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান।
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীতজ্ঞ সনজীদা খাতুনও ছিলেন আমন্ত্রিত শিল্পী। তিনি মঞ্চে আসার আগে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে তাকে বলা হলো ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইবার জন্য। দাদরা তালের এ গানটির সুর ১৮৮৯ সালে গাওয়া শিলাইদহের গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ সুরের অনুষঙ্গে নেয়া ।
১৯৬১ সালে বিশ্বব্যাপী কবির শততম জন্মবার্ষিকীর উৎসবের ছটা এসে লাগে পূর্ব পাকিস্তানেও। শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বুদ্ধিজীবীদের একটি দল পূর্ব পাকিস্তানেও কবির জন্ম শতবার্ষিকী পালন করেন। একইসাথে এ সময় বাঙালির প্রাণের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে জন্ম হয় ‘ছায়ানট’সংগঠনটির ।
১৯৬৭ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ঢাকার নওয়াব বংশোদ্ভূত খাজা শাহাবুদ্দিন বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করে ঘোষণা দিল, ‘রবীন্দ্র সংগীত আমাদের সংস্কৃতি নয়।’ এর সমর্থনে এগিয়ে এলেন চল্লিশজন বাঙালি বুদ্ধিজীবী নামধারী। যাদের মধ্যে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক, আইনজীবী, গায়কও রয়েছেন। বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষে তিনদিন ধরে সকল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ অনুষ্ঠান আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। গভর্নর মোনেম খাঁর পুত্র অনুষ্ঠান পণ্ড করার অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়।
বঙ্গবন্ধু বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসেন। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার প্রেরণা যোগান। রবীন্দ্র সংগীতকে মর্যাদা দান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রসার ঘটানোর জন্য সভা-সমাবেশে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন চালু করান। যার মধ্যে আমার সোনার বাংলা ছিল প্রধান। সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক, ছিলেন যিনি এই আন্দোলনের মুখ্য সংগঠকের অন্যতম, তার উপলব্ধি,‘সাতষট্টির আন্দোলনের সব চাইতে স্থায়ী ফসল “আমার সোনার বাংলা” গানটির যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠা।’
ষাটের দশকে যখন পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, ৬৭ এর ফেব্রু য়ারি,কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে রেসকোর্সের ময়দানের জমায়েতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমরা মির্জা গালিব, সক্রেটিস, শেকসপিয়ার, অ্যারিস্টটল, দান্তে, লেনিন, মাও সেতুং পড়ি জ্ঞান আহরণের জন্য, আর সরকার আমাদের পাঠে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলা কবিতা লিখে বিশ্বকবি হয়েছেন। আমরা এ ব্যবস্থা মানি না_ আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এ দেশে গীত হবেই।’
বঙ্গবন্ধুর সাথে রুখে দাড়ায় ছায়ানট, লেখক কবি শিল্পী সমাজ।সাতষট্টির আন্দোলনের সব চাইতে স্থায়ী ফসল ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠা। সন্জীদা খাতুন যিনি সহ শিল্পীদের নিয়ে, কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন সেই গান তার ভাষাতে -” এ গানকে আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার জনসভায় এ গান না হলেই নয়। বক্তৃতাতে এই গানের বিশেষ উল্লেখ করে তিনি সাধারণ মানুষের কানে এই গানটি এবং সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের নামটি তুলে দিয়েছিলেন”।
বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. ওয়াজেদ তাঁর বইয়ে লিখেগেছেন , বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালে খাবার টেবিলে বসে বলেছেন, ‘আমি যদি নাও থাকি, আর যদি দেশ স্বাধীন হয় তাহলে কবি গুরুর আমার সোনার বাংলা গানটি জাতীয় সঙ্গীত করো”।

১৯৬৫-১৯৭০ এই সময়কাল আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল নানা প্রতিকূলতা। পাকিস্তান সরকার এক পর্যায়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বেতারে ও টিভিতে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল (রবীন্দ্রনাথ হিন্দু বা ভারতীয় লেখক এই অভিযোগে)। তখন আবদুল আহাদ, কলিম শরাফী, ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন, অজিত রায়, আতিকুল ইসলাম, ফজলে নিযামী, জাহিদুর রহিম ও আরও অনেকে অনেকটা প্রতিবাদী ভূমিকা হিসেবে মঞ্চে ব্যাপকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন।
অনেক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক বাফা, ছায়ানট, ঐক্যতান ইত্যাদি সংগঠনের ব্যানারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পাকিস্তান সরকারের বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী ভূমিকার সমুচিত জবাব দিয়েছিলেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি সে সময় প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে দরাজ গলায় গাইতেন জাহিদুর রহিম।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রিয় শিল্পী জাহেদুর রহিমের কণ্ঠেই আমাদের প্রিয় জাতীয় সঙ্গীত শুনতে বেশি ভালোবাসতেন। একনিষ্ঠ শিল্পী জাহেদুর রহিমকে বঙ্গবন্ধু ‘বাবু’ বলেও ডাকতেন। মহান এই শিল্পীর প্রতি জাতির জনকের এই ভালোবাসাই চরম ভোগান্তি ডেকে আনে শিল্পী জাহেদুর রহিমের জীবনে। সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসনকালে তিনি অন্যায়ভাবে চাকুরিচ্যুত হন। অপমানের ভারে, বেদনা সহ্য করতে না পেরে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৮ সালের ১৮ জুন অকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কথা আরেকদিন !
সত্তর সালের গোড়ায় শেখ মুজিবর রহমান পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী জাহিদুর রহিমকে দায়িত্ব দেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড প্রকাশের জন্য। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড প্রকাশে ছায়ানটের শিল্পীরাও এগিয়ে আসেন।

কলিম শরাফীর ব্যবস্থাপনায়, আবদুল আহাদের পরিচালনায়, সনজীদা খাতুনের বাসায় তাঁরই যত্ম-আত্তিতে খাটুনিতে তৈরি হয় গানটি। সম্মেলক কণ্ঠে ছিলেন, জাহিদুর রহিম, অজিত রায়, ইকবাল আহমদ, ফাহমিদা খাতুন,জাহানারা ইসলাম, হামিদা আতিক, নাসরীন আহমদ প্রমুখ। সর্বত্র বাজতে থাকে এই রেকর্ড। অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকালে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের কণ্ঠে এই গান ধ্বনিত হতো।
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পী কলিম শরাফী রমনা রেসকোর্সে লাখো লাখো জনতার উপস্থিতিতে সোনার বাংলাসহ রবীন্দ্রসংগীতের এক সেট গানের রেকর্ড উপহার দিয়েছিলেন সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিজয়ী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।
উল্লেখ্য, চলচ্চিত্রকার শহীদ #জহির #রায়হান ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার বিখ্যাত জীবন থেকে নেওয়া কাহিনীচিত্রে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানের চলচ্চিত্রায়ন করেন।১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ। পরে ৩ মার্চ তারিখে ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে ঘোষিত ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়।
কথিত আছে ‘ আমার সোনার বাংলা আমি তোমার ভালোবাসি’ গানটির সুর নিয়ে একসময় কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। বলা হয় সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া রেকর্ড থেকে যে সুর শুনে শিল্পীরা গানটি তুলেছিলেন সে সুর থেকে নিজেরাই খানিকটা সরে যান। আর সেই সুরই গাওয়া হয়ে আসছে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা কাল থেকে এ পর্যন্ত।
এ বিষয়ে অধ্যাপক সনজিদা খাতুন তাঁর আকাশ ভরা কোলে গ্রন্থের ‘আমার সোনার বাংলা’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন “বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ‘আমার সোনার বাংলা’-র সুর আর স্বরলিপি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তখন ক্যাবিনেট ডিভিশনের এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বলেন যে সুর গেয়ে দেশকে স্বাধীন করা হয়েছে তাই আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর। বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত আমাদের ভুলকে শুদ্ধ করে দিয়েছিল। আজও সেই সুরেই গাওয়া হয় ‘আমার সোনার বাংলা’।”
১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারী বাংলাদেশ সরকার পঁচিশ লাইনের গানটির প্রথম দশ লাইন জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ‘প্রথম ভাগ’ (প্রজাতন্ত্র) এর ৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম দশ চরণ।” যন্ত্রসংগীত ও সামরিক বাহিনীতে ব্যবহার করা হয় গানটির প্রথম চার লাইন। একই বছর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির স্বরলিপি বিশ্বভারতী সংগীত বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত করা হয়।
দেশভাগের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি শক্তি সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ হিংসার দর্শন দ্বারা পরিচালিত হয়েছে । অপরটি ভাষা আন্দোলনের পধ ধরে যে অসাম্প্রদায়িক, মননশীল, উদার মানবিকতার বিকাশ ঘটেছে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল ।
আর বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটেছিলো ধর্মীয় জাতীয়তাবোধকে বর্জন করে। কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে আজ অবধি সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তি তাদের অবস্থান পোক্ত করে তুলেছে ধীরে ধীরে, আর অসাম্প্রদায়িক, মননশীল, উদার মানবিক গোষ্ঠীটি সক্রিয়তা ফেলেছে হারিয়ে ।
স্বাধীনতার পর,বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে বাণীসহ প্রতিদিন বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত জাতীয় সঙ্গীতের সুরে “আমার সোনার বাংলা” গাওয়া হতো। জাতীয় সংগীত প্রথম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় খুনি মোশতাক সরকার। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যার পর জিয়া-ফারুক-ডালিম চক্র রাষ্ট্রপতির আসনে বসায় খন্দকার মোশতাক আহমেদকে।
ক্ষমতায় বসেই মোশতাক ‘বাংলাদেশ বেতার’ নাম পরিবর্তন করে রেডিও বাংলাদেশ করেন। ‘জয় বাংলা’ বাদ দিয়ে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ করেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথিতে দেখা যায়, ১৯৭৫ এর ২৫ আগস্ট ‘রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায় অনুযায়ী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. দ্বীন মুহাম্মদকে।
কমিটিকে ‘এক মাসের মধ্যে পরিবর্তিত জাতীয় সংগীত’ প্রস্তাব করতে বলা হয়। দ্বীন মুহাম্মদ কমিটি তিনটি বৈঠক করে। তারা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ এবং ফররুখ আহমেদের ‘পাঞ্জেরী’ থেকে যেকোনো একটি জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে প্রতিবেদন জমা দেয় ১লা নভেম্বর। কিন্তু ক্যু পাল্টা ক্যুতে ওই প্রস্তাবের মৃত্যু ঘটে ক্ষমতায় আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের ৩০ এপ্রিল, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দ্বিতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এক গোপন চিঠিতে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গান ভারতীয় জাতীয় সংগীত। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকও নন। হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন কবির লেখা গান জাতীয় সংগীত হওয়ায় মুসলিম উম্মাহ উদ্বিগ্ন। এই গান আমাদের সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থী বিধায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন আবশ্যক।’
প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠিতে ‘আমার সোনার বাংলা’র পরিবর্তে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’কে জাতীয় সঙ্গীত করার প্রস্তাব করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠি পেয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ রেডিও, টেলিভিশন এবং সব সরকারি অনুষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশ গানটি প্রচারের নির্দেশনা জারি করে। এ সময় রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি প্রথম বাংলাদেশ গাওয়া শুরু হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়ার মৃত্যুর পর এই উদ্যোগ সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের তৃতীয় দফা উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়। ২০০২ সালে শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ (যুদ্ধাপরাধী এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত। )জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি যৌথ ডিও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বরাবরে জমা দেন।
২০০২ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে দুজন যৌথভাবে বলেন,’সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের ইসলামি মূল্যবোধ ও চেতনার আলোকে জাতীয় সংগীত সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন।‘এই অনুরোধ পত্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রি খুরশীদ জাহান হক,বিষয়টি ‘অতি গুরত্বপূর্ণ’ বলে সচিবের কাছে প্রেরণ করেন। সচিব জাতীয় সংগীত পরিবর্তন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এখতিহার বহির্ভূত বিষয় বলে, তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করে ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট। পরবর্তীতে এ সম্পর্কে আর কোনো তৎপরতা পাওয়া যায় নি।
তারপরেও কিন্তু মাঝে মাঝে উঁকি দেয় সুযোগসন্ধানীরা, তারা জানেনা ভাষার জন্যে আন্দোলন – রবীন্দ্রনাথ – ঊনসত্তরের গণআন্দোলন – মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা, জাতীয় সংগীত অর্জিত হয়েছে মানব প্রাণের একাত্মতা ও জীবন দানের মাধ্যমে, মাটির সুগভীরে শেকড় মেলে দিয়েছে বহু শাখা প্রশাখা, কোনো একটির গায়ে আঁচড় লাগলে টন টন করে ওঠে রক্তে ভেজা দেশ, আর ইতিহাস বলে অপশক্তির জিহ্বা এসব প্রশ্নে যতই লকলক করুক প্রয়োজনে আবার যুদ্ধে যাবে প্রজন্ম !
কৃতজ্ঞতা : ডঃ মুহম্মদ সবুরের প্রবন্ধ
রবীন্দ্রজন্মের দেড়শ বছর – সন্ জীদা খাতুনের সঙ্গে আলাপচারিততে বেবি মওদুদ
ডঃ ওয়াহেদুল হক প্রবন্ধ
রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা গোলাম মুরশিদ
রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু – ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী
রবীন্দ্রজীবনকথা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
দৈনিক পত্রিকা, ইন্টারনেট

Sharing is caring!

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/08/1565330288821.jpg?fit=517%2C319&ssl=1https://i1.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/08/1565330288821.jpg?resize=150%2C150&ssl=1michilUncategorizedআদার্সএক্সক্লুসিভক্যারিয়ারগল্পপলিটিক্সফিচারব্যাক্তিত্বমজার তথ্যমতামতচবি নিউজ,জাতীয়সংগীতের সংগ্রাম ও,বাংলাদে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকু,সোনার বাংলা  culive24desk : জাতীয় সঙ্গীত আর রবীন্দ্রনাথ পেয়েছি কঠোর সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বাংলা দেশাত্ববোধক গানের সূচনা। ১৯০৫ এ রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়, বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাবে প্রভাব নিয়ে আসে গনসংগীত, নজরুলের হাতে যার ঝংকার উঠেছিল পূর্ণাঙ্গভাবে । পঞ্চাশের দশকে মহান ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University