Sharing is caring!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড.আবু ইউসুফ আলম। গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাই দেশের বরেণ্য এ শিক্ষাবিদকে। ড.আবু ইউসুফ আলম মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন, ছিলেন অসম সাহসী ব্যক্তিত্ব, সর্বোপরি একজন সৎ মানুষ হিসেবে যিনি পদচারণা করেছেন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে। চলনে বলনে ভঙ্গিতে চৌকস আভিজাত্য শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবু ইউসুফ স্যার। আচরণ কর্মে প্রস্ফুটিত সরল, অসাধারণ সুতীক্ষ্ন মেধা, সুউচ্চ নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন অভিভাবক ছিলেন। আবু ইউসুফ স্যারের নেতৃত্ব, পাণ্ডিত্য, লেখনি, বক্তৃতা অসাধারণ। মহান এ ব্যক্তিত্বকে আমরা হারিয়েছি গত ২৮ নভেম্বর ২০১০ সালে। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২৫ ফেরুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দায়িত্ব নেন ড. আবু ইউসুফ স্যার। এরপর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে সেশনজট কমানোর নানা উদ্যোগ শিক্ষক শিক্ষার্থী অভিভাবক ও সুশীল সমাজকে আশান্বিত করেছিল। আর এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দীর্ঘ ছুটি কমিয়ে আনা, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়ে অভিভাবকদের সাথে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন, ক্যাম্পাসে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মুক্তি সংগ্রামের স্মৃতি চিহ্ন প্রতিষ্ঠা, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ভর্তি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ লাঘবে ডিজিটাল প্রযুক্তি চালু, অক্টোবর মাসে সম্মান শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ ও ১ ডিসেম্বর ক্লাস শুরু করে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছেন প্রিয় উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার এ তীর্থ ভূমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে।

ক্যাম্পাসকে পড়াশোনা আর গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা ছিলো ইউসুফ স্যারের আজন্ম স্বপ্ন। তার নানা উদ্যোগ আর ইতিবাচক নজর কাড়া সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ভিন্ন সাধের বাঙালির উৎসবগুলোও ছড়িয়ে পড়েছিলো ছায়া ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বিশাল ক্যাম্পাসে। উচ্চ শিক্ষার পীঠ স্থান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউসুফ স্যার হাজারো স্বপ্ন লালন করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন সেশন জটসহ যে সব সমস্যা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন সর্বোচ্চ আসনে গিয়ে তা কমিয়ে আনার চেষ্টারত ছিলেন আমৃত্যু।

ড.আবু ইউসুফ স্যার চিন্তা চেতনার মধ্যে লালন করতেন প্রিয় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। এটি ছিলো তার কাছে সন্তানতুল্য। উপাচার্য হওয়ার পর তিনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এ প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন,বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রাণ চাঞ্চল্য কর্মচঞ্চল সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছ কাঁচের মতো একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয় হবে চাঁদের মতো স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত। বিশ্ববিদ্যালয় হবে নানা মত ও পথের মানুষ ও পেশার বিচরণ ক্ষেত্র। উচ্চ শিক্ষার জন্য এসে উচ্চতর বিষয় নিয়ে হবে গবেষণা চর্চা। সবাই বলবে হিত কথা, আর শিক্ষকরা বিতরণ করবেন হিতোপদেশ। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজের শুরুতেই নানা চক্রান্তেরও শিকার হন সাহসী এ মানুষ।

২৫ জানুয়ারি ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রতি মুহূর্তকে তিনি ব্যবহার করেছেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি অফিস করতেন। অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির কাছে কখনো মাথা নত করেননি। বয়সী ছাত্র নেতাদের অন্যায় আবদারকে প্রশ্রয় দেননি কখনো। পবিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাঠি, রড কিংবা অস্ত্র নিয়ে কাউকে প্রাধান্য বিস্তার করতে দেননি। এমনকি দুইটি রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের সময় পুরো রাত ক্যাম্পাসে কাটিয়ে দেয়ার নজির সৃষ্টি করেন তিনি। স্যারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা লাভবান হলেও কতিপয় শিক্ষক স্যারের এসব সফলতা ও কর্মকাণ্ড শুরু থেকে বিরোধিতা করতেন। নিজেদের চাওয়া পাওয়ার হিসাব মেলাতে অনেকে ষড়যন্ত্রের সাথে হাত মিলিয়েছে। তাই যে কোন সংকটে প্রতিপক্ষকে উসকে দেয়ার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অচল করার হীন চেষ্টা চালাতেন। সরলতাকে দুর্বলতা মনে করে অবৈধ সুযোগ না পেয়ে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন শিক্ষিত এসব গোঁয়াররা। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ন্যায়ের হাত কলুষিত হতে দেননি। নির্লোভ এ প্রিয় ব্যক্তিত্ব আবু ইউসুফ স্যার সততার অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আজীবন বেঁচে থাকবেন।

জীবনে বেঁচে থাকতে হলে একজন ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে একজন আদর্শ শিক্ষক সেদিকে তেমন দৃষ্টি দেন না। তাঁর কোনটা প্রয়োজন। সম্মান না অর্থ। তিনি সম্মানকেই বেছে নেবেন। আজকাল কোনো কোনো শিক্ষকের কথা শুনে নানা প্রশ্ন জাগে মনে। পত্রপত্রিকায় খবর বের হয়, যাদের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই, তাদের শিক্ষক করা হয়। অযোগ্যদের নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে প্রায়শ। নকল করে পাস করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, তাদের কেউ কেউ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে অধিষ্ঠিত। এক্ষেত্রে আবু ইউসুফ আলম ছিলেন অনড় ও নির্ভীক। তবে একজন জীবিত আবু ইউসুফের চেয়ে মৃত আবু ইউসুফ কতোটা শক্তিশালী তা অনুভব করি তার মৃত্যুর পর। তিনি যে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অন্তরে আছেন তা অনুভব করি প্রায়শ। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক ছিলেন না আবু ইউসুফ স্যার। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার দুঃসময়ের সারথী ছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে শায়িত করা হয়। তবে গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর ধলই গ্রামে একটি চত্বর ছাড়া আর কোন স্মৃতি চিহ্ন নেই এ শিক্ষাবিদের নামে। ইট পাথরের স্মৃতি চিহ্ন না থাকলেও কম সময়ে আদর্শ মানব হওয়া প্রিয় ব্যক্তিকে শত বছর পরে হলেও জানাবে বিনম্র শ্রদ্ধা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ড. আবু ইউসুফ একজন সৎ সাহসী শিক্ষক, প্রশাসক, অভিভাবক হিসেবে শিক্ষক শিক্ষার্থী কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অভিভাবকদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

Sharing is caring!

https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/06/ড.-আবু-ইউসুফ-আলমের-মতো-মানুষ-এখন-বিরল.jpg?fit=650%2C433&ssl=1https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/06/ড.-আবু-ইউসুফ-আলমের-মতো-মানুষ-এখন-বিরল.jpg?resize=150%2C150&ssl=1culiveক্যাম্পাসচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল,ড.আবু ইউসুফ আল্‌চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড.আবু ইউসুফ আলম। গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাই দেশের বরেণ্য এ শিক্ষাবিদকে। ড.আবু ইউসুফ আলম মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন, ছিলেন অসম সাহসী ব্যক্তিত্ব, সর্বোপরি একজন সৎ মানুষ হিসেবে যিনি পদচারণা করেছেন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে। চলনে বলনে ভঙ্গিতে চৌকস আভিজাত্য শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবু ইউসুফ স্যার। আচরণ কর্মে প্রস্ফুটিত...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University