Sharing is caring!

নব্বই দশকে প্রথম আমি গিয়েছিলাম ভারতের দক্ষিনাঞ্চলের চিন্নাই। যাকে আমরা তামিল লাডু প্রদেশ হিসাবেই জানি। সেখানে গিয়ে ওই সময় অবাক হয়েছিলাম সেখানকার নারীরা কাপড়ের দোকান, কসমেটিকসের দোকান এমনকি কাঁচা তরিতরকারির দোকান খুলে ব্যবসা করছেন। মনে মনে ভাবছিলাম এও কি সম্ভব, যে নারীদের ঘরে বসে থাকার কথা সেই নারীরা উপার্জনে সৎ পথে ব্যবসায় নেমেছে! আশ্চর্য হলেও সত্য আজ হতে ২৭ বছর আগের চিন্নাই শহরের নারীদের মনবল, উপার্জনদক্ষতায় তারা পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে যা দেখে এসে ভাবছিলাম আমাদের এই বাংলাদেশে হয়তো এটি কেনদিন সম্ভব হবে না। হয়তো রাজধানী ঢাকায় হতে পারে কিন্তু তৃণমুল পর্যায়ে মফস্বল শহরগুলোতে নারীরা দোকান খুলে পুরুষদের মতো পসরা নিয়ে বসে ব্যবসা করবে? শুধু চিন্নাই নয়, ব্যাঙ্গলোর , এমনকি সে সময় কলকাতা শহরেও দেখে এসেছিলাম নারীদের কর্মদক্ষতা।

আজ বহিৃর বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশে পরিবর্তন ঘটেছে। শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাহিরের জেলা উপজেলা শহরগুলো এখন সমঅধিকারের প্রতিযোগীতায় নারীরা সফলায় এগিয়ে গেছে। যে সফলতা একজন পুরুষকেও হার মানিয়ে চলছে। অসংখ্য নারী আজ বাংলাদেশে ঘিরে কর্মষ্ঠ হয়ে উঁচুতলায় পৌছে গেছে। তারা জয়ীতা হচ্ছেন। সরকারী চাকুরী হতে আধা সরকারী সহ প্রতিটি সেক্টরে নারীদের বিচরন দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

আজ এমন এক নারীর সফলতা নিয়ে লিখছি যিনি শিশু বয়সেই সংসারের হাল ধরে খেয়ে না খেয়ে আজ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।

নার্গিস জামান গোলাপী । তিনি ঠাকুরগাঁও শহরের নর্থ সার্কুলার রোডে অবস্থিত হাওলাদার মার্কেটে তৈরী পোষাকের নারী ব্যবসায়ী এবং মালিক। এখন তার ব্যবসার বিশাল প্রসারতা ঘটেছে। সফলতায় তিনি তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছেন “কুসুম কুমারী”। – মহিলা- শিশুদের তৈরী পোষাক হতে যে কোন কাপড় এবং বিভিন্ন ধরনের পোষাকে পরিপূর্ন কুসুম কুমারী। কোন ক্রেতা কুসুম কুমারীতে গিয়ে তাদের চাহিদামতো পোষাক পায়নি এমন কথা হয়তো-বলতে পারবেন না।

মালিক হলেও দোকানে , তিন পুরুষ ও এক নারী কর্মচারীর সঙ্গে তিনিও যেন কর্মচারী। তবে তার শুরুর পথচলা মসৃণ ছিলো না। সপ্তম শ্রেনীর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে যখন তিনি ৮ম শ্রেণীতে উঠেছেন ঠিক সে সময় ১৯৮৭ সালের ১২ জানুয়ারী নার্গিস জামান গোলাপীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর এসএসসি এবং এইচএসি পাশ করেন। এর মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়। স্বামী রোকুজ্জামান চাকুরী করতেন একটি ব্যাংকে। তার অসুস্থতায় তিনি সেই চাকুরী করতে পারেননি। হলেন বেকার। চিন্তায় মাথা ভারী হয়ে এলো গোলাপীর। ডাক নাম গোলাপী। যা গোলাপ ফুলের সঙ্গেই যেন নামের মিল। আমরা জানি গোলাপে কাঁটা আছে। কিন্তু এই কাটা যে সেই কাটা নয় তা দেখিয়ে দিতে নিজেই মাঠে নামলেন গোলাপী। সকল বাঁধা পেরিয়ে তিনি পথ খুঁজতে লাগলেন। পেয়ে গেলেও পথ। ছুটলেন ঠাকুরগাঁও উত্তরা ব্যাংকে। পেলেন ঋণ। অল্প পূঁজির টাকায় ২০০৯ সালে শুরু করলেন তৈরী পোষাকের ব্যবসা। শহরে প্রথমে বাসা ভাড়া নিলেন। এই শহরের শহীদ মহম্মদউল্লাহ সড়কে প্রথম খুললেন তৈরী পোষাকের দোকান। নাম দিলেন “কুসুম কুমারী”। ধীরে ধীরে প্রসারতা পেলো তার তৈরী পোষাকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এরপর ২০১৩ সালে এসে ব্যবসার প্রসারতায় স্থান পরিবর্তন করলেন ঠাকুরগাঁও শহরের নর্থ সার্কুলার রোডে অবস্থিত হাওলাদার মার্কেটে। এখন সেখানেই চলছে তার উপরে উঠার সিঁড়ির বহুতল ভবন।

জীবন সংগ্রামে যে সফলতা আসে তা তিনি দেখিয়ে দিলেন । ঠাকুরগাঁও অদুরে কচুবাড়ি মাদারগঞ্জ। সেই গ্রামের লিয়াকত আলীর মেয়ে গোলাপী। আজ ব্যবসায় তিনি এই শহরের গোয়ালপাড়া মহল্লায় সোয়া আটকাঠা জমি কিনলেন। ধীরে ধীরে মাথা গোছানোর ঠাই করে বাড়িও তৈরী করে ফেললেন। মজার বিষয় তিনি ৫৮টি লিচুর গাছ রোপন করেছেন গ্রামের বাড়িতে। এখন প্রতি বছর ওই বাগান হতেও তার আয় রোজগার হচ্ছে। সেই থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ছেলে বড় হয়ে এখন ঢাকায় ইলেক্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। মেয়ে ঠাকুরগাঁও কলেজের অর্নাসের শিক্ষার্থী।

কথা হয় নার্গিস জামান গোলাপী সাথে। তিনি দোকানের কাস্টমার সামলাতে সামলাতে, তার সংক্ষিপ্তভাবে জীবনিটা তুলে ধরে বললেন কম বয়সে বিয়ে ও মা হওয়ায় সন্তানদের আমার নিকট সন্তান মনে হয় না। তাদেরকে আমার বন্ধু মনে হয়। ব্যবসায় সাফল্যের বিষয়ে গোলাপী বলেন, আন্তরিক ব্যবহার, ধৈর্য্য ও সততা ব্যবসার সফলতা এনে দেয়। আগামীতে দুঃস্থ নারীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার ইচ্ছে রয়েছে। যেখানে নারীরা কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারে।- এই নারীর সফলতা দেখে অনেকেই মন্তব্য করে বলেছেন নার্গিস জামান গোলাপী- তার মনোবলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিকে যেন তার নামের মধ্যেই গোলাপের বাগানে পরিনত করেছে। যেখানে কাটা নেই। আছে সফলতা-।

প্রতিবেদনটি লিখেছেন দৈনিক জনকন্ঠের স্টাফ রিপোর্টার তাহমিন হক ববী

Sharing is caring!

https://i1.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/05/“গোলাপীর-এ-যেন-গোলাপ-বাগান”-একটি-সফলতার-গল্প.jpg?fit=330%2C300&ssl=1https://i1.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/05/“গোলাপীর-এ-যেন-গোলাপ-বাগান”-একটি-সফলতার-গল্প.jpg?resize=150%2C150&ssl=1culiveগল্পগল্প,গোলাপীনব্বই দশকে প্রথম আমি গিয়েছিলাম ভারতের দক্ষিনাঞ্চলের চিন্নাই। যাকে আমরা তামিল লাডু প্রদেশ হিসাবেই জানি। সেখানে গিয়ে ওই সময় অবাক হয়েছিলাম সেখানকার নারীরা কাপড়ের দোকান, কসমেটিকসের দোকান এমনকি কাঁচা তরিতরকারির দোকান খুলে ব্যবসা করছেন। মনে মনে ভাবছিলাম এও কি সম্ভব, যে নারীদের ঘরে বসে থাকার কথা সেই নারীরা...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University