Sharing is caring!

শিরীন কাদীরের ‘আমার জীবনের কিছু কথা’ গ্রন্থটি কেবল এক নারীর আত্মজীবনী নয়, বরং তার অতিরিক্ত কিছু। এ আত্মজীবনীর অবশ্যই একটি বিশেষ সামাজিক মূল্য আছে। গ্রন্থটি সাধারণ দৃষ্টিতে একটি পরিবারের বিকাশ ও উন্নয়নের সামাজিক দলিল। বৃহত্তর অর্থে আমাদের সমাজ একটি নবীন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ উত্থান পর্বের ব্যক্তিগত পারিবারিক স্মারক। বিষয়টি পারিবারিক হলেও প্রত্যক্ষভাবে এর সংযোগ রয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার। সময়ের আয়নায় ব্যক্তি ও পরিবারের একটি সামগ্রিক রেখাচিত্র এ গ্রন্থে পাওয়া যায়। পাওয়া যায় আমাদের সমাজের সাধারণ ব্যক্তি ও পরিবারজীবনের সংগ্রামের অন্তরঙ্গ টুকরো টুকরো সরল চিত্র।

১৯৭১ সাল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরির পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণের জন্য যে অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি করেছিল, সেই সুযোগ আমরা শতভাগ ব্যক্তি ও পারিবারিকভাবে কাজে লাগিয়েছি। এক স্বাধীন দেশের পাসপোর্টকে সম্বল করে প্রতিটি পরিবার থেকে ভাগ্য পরিবর্তনে ছড়িয়ে পড়েছি আমরা বিশ্বময়, পরিবারের কেউ না কেউ অথবা গোটা পরিবার। পড়াশোনা ও পেশাগত সাফল্য নিয়ে দেশে ফিরেছে এদের কেউ কেউ; দক্ষতা-পুঁজি ও প্রযুক্তিকে সঙ্গে করে। একজন সংগ্রামী মায়ের হাতে সন্তানদের সেই বেড়ে ওঠাই সরলভাবে বলেছেন আত্মকথনের ঢঙে। আমাদের পরিবার ও ব্যক্তিদের নিজস্ব উদ্যোগ-শ্রম-সাহস-সৃজনশীলতা ও সামগ্রিকভাবে উদ্যোক্তা চরিত্র দিয়ে নিজেদের এরা প্রতিষ্ঠিত করেছে। সমাজের একেকটি পরিবার ও পরিবারের একেক ব্যক্তি যে অপরিসীম শক্তি ও তাদের ব্যক্তির সাফল্যগাথার দৃষ্টান্ত রচনা করে চলেছেন, তার সমবায়ে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলছে আমাদের জাতীয় উন্নয়নের রথযাত্রা। নিচু স্বরে এ গ্রন্থটির মূল গল্পটি যেন আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

শিরীন কাদীরের জীবনব্যাপ্তি প্রায় শতাব্দীকালজুড়ে। এক শতকের উত্থান-পতন দেখেছেন চোখের সামনে। এক জীবনে দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। নিজের জীবনের স্মৃতি-অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই লিখেছেন তার এ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। অল্প বয়সেই হারিয়েছিলেন স্বামীকে। তারপর শুরু হয় ১০ সন্তানকে মানুষ করার কঠোর সংগ্রাম। সন্তানদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলায়ই ছিল তার সার্বিক মনোযোগ। শিক্ষাকেই ভেবেছেন তার সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ মাধ্যম, আর তা অর্জনে ত্যাগ করেছেন সর্বোচ্চ। নিজের সেই সংগ্রামের ফলও তিনি পেয়েছেন। তার ১০ সন্তানের সবাই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আজ সফল। তিন ছেলে সরাসরি দেশের প্রযুক্তির উন্নয়নে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।

লেখিকা তার আত্মজীবনী লেখার কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৯৯ সালে। বহুদিন প্রকাশের অপেক্ষায় পাণ্ডুলিপিটি পড়ে ছিল। অবশেষে ২০১২ সালে সাহিত্য প্রকাশ গ্রন্থাকারে তার এ আত্মজীবনী প্রকাশ করে। গ্রন্থটি পূর্ববঙ্গের সমাজ-ইতিহাস নিয়ে কৌতূহলী যে কাউকে আগ্রহী করবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জরুরি কিছু বিবরণী পাওয়া যাবে এ গ্রন্থে।

শিরীন কাদীর তার সরল উপস্থাপনায় আর ভাষায় তুলে এনেছেন তার জীবনের গল্প ও সময়কে। তার জন্ম ১৯৩৩ সালে, যশোরে। শৈশব কেটেছে বৃহত্তর যশোর জেলায়। তাদের গ্রামের বাড়ি ছিল তৎকালীন যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার মির্জাপুর গ্রামে। তার বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। তিনি শুরুতে নড়াইল মহকুমার বড়দিয়া বাজারে তার ডিসপেনসারিতে চিকিৎসা করতেন। পরবর্তীতে তিনি বড়দিয়া ছেড়ে নিজেদের গ্রাম মির্জাপুরে চলে আসেন। শিরীন কাদীরের শৈশবটা ছিল একটু ভিন্ন। কারণ তার আগে তার তিন ভাইবোন মারা যায়। মা-বাবা তাই তাকে নিজেদের সব ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন। মির্জাপুর গ্রামটিতে শিক্ষিত পেশাজীবীদের একটি অবস্থান ছিল। ছোট্ট শিরীনকে তার বাবা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। ঘটনাটা আজকের দিনে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও সেদিন তেমনটা ছিল না। বিষয়টা শিরীনের জবানিতেই শোনা যাক, ‘স্কুলে ছেলের সংখ্যাই বেশি। তখন গ্রামের মা-বাবারা তাদের মেয়েদের বাংলা-ইংরেজি খুব একটা শেখাতে চাইতেন না। তারা চাইতেন আরবি শেখাতে। ক্লাসে আমরা মাত্র পাঁচজন মেয়ে ছিলাম।’ চতুর্থ শ্রেণীতে তখন দিতে হতো ইউপি পরীক্ষা, যা পরবর্তীকালের বৃত্তি পরীক্ষার মতো। স্কুলশিক্ষক চাচাতো ভাইয়ের কাছে রীতিমতো বিশেষভাবে পড়াশোনা করে শিরীন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হলেন। পরীক্ষার পর শিক্ষকরা তাদের নড়াইলের জমিদার বাড়িতে ঘুরতে নিয়ে যান। সেই জমিদার বাড়িতে শিরীন একা একা ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে যা দেখেন, তা তার কাছে কেমন গল্পের মতো মনে হয়। সে বিবরণী লেখিকার জবানিতে শোনা যাক, ‘জমিদার বাড়ি ঘুরে দেখার সময় ভুল করে একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেছি। হঠাৎ দেখি, খুব সুন্দর এক মহিলা মেঝের ওপর বসে রুপার বাটিতে রুপার চামচে তার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। ওরা বসে আছে মার্বেল পাথরের মেঝেতে। সবটাই যেন স্বপ্নের মতো। একটু পরে দেখলাম অন্ধকূপ। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আরেক পাশে নিচের ঘরে দেখলাম কালো মিশমিশে বড় বড় গদি আঁটা সোফা, তার হাতলে সিংহের মূর্তি আঁকা।… জমিদারদের প্রাচুর্য বোঝার মতো বয়স হয়নি তখন আমার। আমি ওদের প্রতিটি জিনিস দেখেই ভীষণ খুশি আর অবাক হচ্ছিলাম।’

পিতা মির্জা আব্দুল গণী ছিলেন আধুনিক, উদার মানুষ। মির্জাপুরে থিয়েটারের ‘শাহজাহান’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন শাহজাহানের চরিত্রে। ছোটবেলায় মেয়েকে চুড়ি পরতে দিতেন না। কারণ তার মতে, এতে মেয়েদের হাতের কবজি চিকন হয়ে যায়। তারপর তিনি মির্জাপুর ছেড়ে কলকাতায় গেলেন ডাক্তারি করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি কলকাতা ছেড়ে ফিরে এলেন আবারো যশোরে। সদরের মিস্ত্রি রোডে চালু করলেন তার ডিসপেনসারি।

শিরীন কাদীরের যখন বিয়ে হয়, তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর। তিনি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। বর আনোয়ারুল কাদীর তখন সবে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছেন। বিয়ের পর আনোয়ারুল কাদীর ভর্তি হন বিএতে। ভর্তি হন খুলনার বিএল কলেজে। অন্যদিকে শিরীনের বাবা চেয়েছিলেন, তার মেয়ে নতুন করে পড়াশোনা করুক। ইচ্ছাটি তিনি জামাইয়ের কাছে ব্যক্ত করেন। তারও কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু সমস্যাটা ছিল তখনকার সামাজিক অবস্থা। সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে শিরীন কাদীর লিখছেন, ‘তখনকার সামাজিক বিশ্বাস অনুযায়ী মুসলমানের ছেলের বউ শহরের স্কুলে পড়বে, এটা গর্হিত কাজ। তাতে আমার শ্বশুরের সম্মানের হানি ঘটতে পারে। আমার স্বামী মা-বাবার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতেন না। তাই সাহস করে এ প্রস্তাবটা কখনো তাদের কাছে বলেননি পর্যন্ত। আমার মনের দুঃখ মনেই থেকে যায়।’ কিন্তু পড়াশোনা আর জ্ঞানের প্রতি এক অকৃত্রিম টান থেকে গেছে আজীবন। তার সেই স্বপ্ন পরবর্তীতে বাস্তবায়ন করেছেন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরির মাধ্যমে।

সাতচল্লিশে দেশভাগ হলো। স্বামীর চাকরিসূত্রে শিরীন গেলেন নারায়ণগঞ্জে। এ সময় জন্ম হয় তার প্রথম সন্তান কন্যা মঞ্জুর। চাকরির পাশাপাশি আনোয়ারুল কাদীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হলেন। ১৯৫০ সালের দিকে স্বামীর কর্মস্থল পরিবর্তনের সূত্রে চলে এলেন ঢাকায়, আজিমপুর কোয়ার্টারের বাসায়। কিছুদিন পর এল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ‘১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিকালে দলেবলে ছেলেরা সাইকেল করে বলে যাচ্ছিল বাসার সামনে দিয়ে, রাষ্ট্র ভাষাবাংলা চাই; ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তলাল হলো ঢাকার রাজপথ। মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো হলো। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো কত তাজা প্রাণ চলে গেল ওইদিন।’ মাস দুয়েক পর কাদীর পরিবার ঢাকা থেকে যশোর চলে গেল। যশোর শহরে জায়গা কিনে শুরু হলো শিরীন কাদীরের নতুন যাত্রা। ১৯৫৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে যশোর শহরে ওকালিত শুরু করেন তার স্বামী। ওদিকে শিরীন কাদিরের পরিবারও বড় হচ্ছিল— চার কন্যার পর জন্ম হলো প্রথম পুত্র ইকবাল কাদীর। বড় বোন তার নাম রাখলেন পিন্টু। এরই মধ্যে বড় দুই মেয়ে মঞ্জু ও রঞ্জুর বিয়ে দিলেন। মঞ্জু তখন ম্যাট্রিক দিয়েছেন আর রঞ্জু নবম শ্রেণীর ছাত্রী। শিরীন এত অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু মেয়েদের বাবা ইঞ্জিনিয়ার বর পেয়ে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন। সেজো মেয়ে অঞ্জু গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর বড় ছেলে পিন্টু তখন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে। শিরীনের পরিবার তখন দুধে ভাতে। বাড়ির নাম রাখা হলো ‘শিরীন অঙ্গন’।

এরপর এল জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়, যা কাদীর পরিবারকেও প্রবলভাবে স্পর্শ করে গিয়েছিল। এ সম্পর্কে শিরীন তার বইয়ে লিখছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত নেমে এল দেশবাসী সবার ওপর। আমার ছোট ছেলে চন্দনের বয়স তখন ২১ দিন। ওইদিন আমাদের বাড়ির সামনে সদর রাস্তায় পাড়ার কয়েকটা যুবক ছেলে টহল দিচ্ছিল। ওরা আমার কর্তাকে বলল, উকিল সাহেব, আপনি ঘরের বাইরে আসবেন না। আমরা বাইরে আছি, যদি কোনো অসুবিধা হয় আমরা দেখব। ব্যাপার কিছুই বুঝলাম না। কিছুক্ষণের ভেতরেই পশ্চিম পাশের রাস্তা দিয়ে মিলিটারি ভ্যান এসে হাজির। মুহূর্তের মধ্যে পাড়ার ছেলেরা দৌড়ে পালিয়ে গেল। মিলিটারির গাড়িগুলো আমাদের বাড়ির সামনে থেকে শুরু করে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিস ঘিরে ফেলল। শুরু হলো জীবনের অভিজ্ঞতার এক অন্য অধ্যায়।’ শিরিন অঙ্গনের কাছেই টেলিফোন এক্সচেঞ্জের ছাদে পাকিস্তানি সেনারা টহল দিত। মিলিটারি ও বিহারিদের মিলিত আতঙ্কের বিবরণ পাওয়া যায় শিরীনের লেখায়, ‘রাতের বেলায় ঘরে বসেই গুলির শব্দ পেতাম। এক্সচেঞ্জ অফিসের ছাদ থেকে মিলিটারিরা চতুর্দিকে গুলি ছুড়ত। একদিন সকালবেলায় আমার মেজো ছেলে টনী (তারিক কাদীর) ও সেজো ছেলে শাম্মী (খালিদ কাদীর) বাড়ির উঠোনে— টিউবওয়েলের সামনে বালির ভেতর একটা গুলি এসে পড়ল। হঠাৎই ছিটকে উঠল বালি। খোদার অশেষ রহমত যে, আমার ছেলে দুটি বেঁচে গেছে। রাস্তা দিয়ে রাতের বেলায় বিহারিরা যাতায়াত করত। তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকত ছোরা, দা-কুড়াল। ওদের কথাবার্তায় স্পষ্ট বোঝা যেত যে, কোনো একটা অপারেশনে যাচ্ছে তারা। অপারেশন মানেই বাঙালিদের হত্যা করা।’ এপ্রিলের শুরুতেই যশোরের বাড়ি ছেড়ে গ্রামের দিকে চলল কাদীর পরিবার। সঙ্গে কোলের শিশু কামাল কাদীর। সেপ্টেম্বরের দিকে মিলিটারিরা গ্রামে বেশি আক্রমণ করবে শুনে তারা ফিরলেন যশোরে। গিয়ে দেখলেন, তাদের সেই প্রিয় বাড়িতে আস্তানা করেছে রাজাকাররা। একদিন নিজের বাড়ি দেখতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে শত শত রাইফেল মজুদ করা। তাদের ঘরের প্রতিটি আসবাব, জীবনের সব সঞ্চয় সম্পদ লুট হয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষ হলে ফিরলেন বাড়িতে। কিন্তু বাড়ি তখন এক ধ্বংসস্তূপ। নেয়ার মতো সবই রাজাকাররা লুট করেছিল। কিন্তু এক বিহারি প্রতিবেশী পুরো বাড়িটা পোড়াতে দেয়নি। তবে রান্না করে বাড়িতে কালিঝুলি মাখিয়ে রেখে গেছে সব জায়গায়। দেশের অন্য সব মানুষের মতো আবার নতুন করে সংসার শুরু করতে হলো কাদীর পরিবারকে।

মুক্তিযুদ্ধের পর্ব সামলে উঠতেই শিরীন কাদীর তার জীবনের সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়েন। ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন তার স্বামী, যিনি ষাটের দশক ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন অবধি স্বাধীনতার আদর্শে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। ১০ সন্তানের জননী শিরীন কাদীরের জীবনের সংগ্রামময় তৃতীয় অধ্যায়ের শুরু হলো। এ কঠিন সময় সম্পর্কে তিনি লিখছেন, ‘আমি স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে কঠিন হয়ে গেলাম সংসার পরিচালনায়। স্বামীর একটা আদর্শকে আঁকড়ে ধরে আমি এগিয়ে চলতে থাকি সামনের দিকে। যুদ্ধের ভেতরে যখন গ্রামে বসে প্রতিদিন সকালবেলায় শুরু করে রাত পর্যন্ত আমি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে পড়তাম, তখন হঠাৎ একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, যে পরিস্থিতির ভেতরে আছি, এতে যেকোনোদিন গুলি খেয়ে মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু তোমার ভেঙে পড়ার কিছুই নেই। আমি তো আমার ছেলেমেয়েদের ভেতর দিয়েই বেঁচে থাকব। দরকার হলে আমাদের দোতলা বাড়ির প্রতিটি ইট খুলে খুলে বিক্রি করে দেবে, তবু কিছুতেই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করো না। আমি ঠিক তা-ই করতে লাগলাম।’ মা-বাবার দায়িত্ব একসঙ্গে পালন শুরু করলেন শিরীন। সময়মতো পড়তে বসা, স্কুল-কলেজে ঠিকমতো যাওয়া নিয়ে তিনি কঠোর। পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠানোর। পিতার অবর্তমানে সন্তান নিজেই বাবার সে ইচ্ছা পূরণে সচেষ্ট হলেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার আগেই পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমালেন আমেরিকায়। শিরীন কাদীর যশোরে তাদের এক টুকরো জমি বিক্রি করে বড় পুত্রের আমেরিকা যাওয়ার টিকিটের খরচ জোগাড় করলেন। ইকবাল কাদীর আমেরিকায় সোয়ার্থমোর কলেজে পড়তে গেলেন। সেজো মেয়ে অঞ্জু তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করলেন। মেজো পুত্রের লক্ষ্য ছিল বিদেশে পড়তে যাওয়ার। বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণাও ছিল। ১৯৮১ সালে টনী সোয়ার্থমোর কলেজে পড়তে গেলেন। আরেক মেয়ে গিনি বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে আমেরিকায় চলে যান। শিরীন কাদীরের সেজো ছেলে খালিদ কাদীর মিডলবারি কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়ে পড়তে যান ১৯৮৬ সালে। ইকবাল কাদীরের আমেরিকায় পড়াশোনার পাশাপাশি ভাইবোনদের ব্যাপারেও সতর্ক দৃষ্টি ছিল। এবার ভাইয়েরা মাকে আমেরিকায় নেয়ার তোড়জোড় শুরু করলেন। শিরীন কাদীরের সংগ্রামের ফল এবার যেন ফেরত পেতে শুরু করলেন। সন্তানরা বিদেশের মাটিতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৮৮ সালে শিরীন কাদির পুত্র-কন্যাদের উদ্দেশে আমেরিকায় যান। পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৯৯২ সালে বিক্রি করে দেয়া হলো যশোরের ‘শিরীন অঙ্গন’। অব্যক্ত বেদনা তখন চাইলেও তিনি মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি। এর মধ্যে ছোট ছেলে কামাল কাদীরও চলে গেছেন আমেরিকায়, ভর্তি হন ওবারলিন কলেজে।

পঞ্চাশের দশকে যশোরে তাদের বাড়িতে সুলতান কিছুদিন ছিলেন। শিরীনের বাবার সঙ্গে শিল্পীর বেশ সুসম্পর্ক ছিল। শিল্পীর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ১৯৯৪ সালে শিরীন কাদীর দেশে এসে শিল্পী এসএম সুলতানকে দেখতে যান। পারিবারিক এ সম্পর্ক ছাপিয়ে সুলতানের ছবি তার জীবন সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি তার গ্রন্থে সরলভাবে উপস্থাপন করেছেন; সুলতান তার ছবিতে কৃষকসহ সাধারণের যে পেশিবহুল ছবি এঁকেছেন। সুলতানের ছবির পেছনের দর্শন সাধারণ মানুষ যে ক্ষমতার আধার, সেই শক্তি তিনি নিজের মধ্যে অনুভব করেছেন। জীবনব্যাপী সংগ্রামে এ অনুপ্রেরণা তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।

সন্তানদের সঙ্গে শুধু আমেরিকায় নয়, আরো অনেক দেশ ঘুরেছেন শিরীন কাদির। সেসবের বিবরণও আছে আমার ‘জীবনের কিছু কথা’ গ্রন্থে। এমন একটি ঘটনা কাদীর পরিবারের দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ও দেশে বিনিয়োগ করার তাগিদ সৃষ্টি করল নিজেদের মধ্য। তার ইঙ্গিত পাই শিরীন কাদীরের লেখায়, ‘…ঠিক হলো, সবাই চন্দনের কলেজে যাব। …ভোর ৭টায় ওবারলিনে পৌঁছি। সেখানে খোঁজাখুঁজি করে ওর রুমে উঠি। চন্দনের রুমে আমাদের ঘুম ভাঙল সকাল ১১টায়। ১২টায় গেলাম এক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হলো। তাকে চন্দন আগেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছিল।’

সালটি ছিল ১৯৯৩। উপরের কাহিনীতে তিনটি চরিত্র আমরা পাই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাদে বাকি দুজন সহোদর ভাই। পরবর্তীতে তারা দেশের সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। বাকিজন মা, ঘটনার ভাষ্যকার। বাংলাদেশের যোগাযোগ ও মোবাইল ব্যাংকিং, বৃহত্তর দুই খাতের উন্নয়নে এরা দুজন মূল উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেছেন। প্রথম খাতটি ছিল মোবাইল টেলিফোন, যার প্রাথমিক আরম্ভটা গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এ অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে ধারাবাহিকভাবে গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ই-কমার্স প্লাটফরম সেলবাজার। পরবর্তীতে দেশের বৃহত্তর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিকাশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমেরিকাসহ পশ্চিমে পরিচিত হওয়া শুরু করেন। আর আমেরিকায় অভিবাসিত কাদীর পরিবারের বড় ছেলেটি (ইকবাল কাদীর) প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশে বিনিয়োগ করার, প্রযুক্তি হস্তান্তরের। প্রযুক্তি খাতে বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিকে কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, সে সুযোগটি খুঁজছিলেন।

যদিও এরা দেশ থেকে নিয়েছেন খুবই যৎসামান্য। পড়াশোনা করেছেন আমেরিকার বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়েছেন। তবুও দেশের কাজে আসার এক অকৃত্রিম অকুতি। সেই তাড়নায় থেকে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সৎ অর্জিত পুঁজি নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে দেশে এলেন নীরবে। মা এক্ষেত্রে ছেলেদের অনুপ্রেরণা, ভরসা এবং পরবর্তীতে ছোট ভাইদের আদর্শ বড় ভাই ইকবাল কাদীর।

শিরীন কাদীরের ‘আমার জীবনের কিছু কথা’ গ্রন্থটি তার নিজের জীবনের গল্প হলেও বিগত এক শতকের ইতিহাসের অনেক কালপর্ব, সমাজ বিবর্তনের অনেক চিহ্ন এতে বিধৃত হয়েছে। একটি পারিবারের বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে সমাজের ছোট ছোট পরিবর্তন ও সামগ্রিক উন্নতি ক্রমান্বয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। সে বিবেচনায় এক সংগ্রামী নারীর এ আত্মজীবনী তাই শেষ অর্থে নিজের আত্মকথার পাঁচালি ডিঙিয়ে সমাজ ইতিহাসের দলিল ও অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে ব্যক্তিসংগ্রামী সত্তার অনুকরণীয় প্রতিকৃতি। কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা এ অনুকরণীয় সংগ্রামী নারীর প্রতি। তার বাকি জীবন সুন্দর, সুস্থ ও আনন্দদায়ক হোক। ব্যক্তি শিরীন কাদীরের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।

Sharing is caring!

https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/05/base_1519913434-9.jpg?fit=500%2C335&ssl=1https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/05/base_1519913434-9.jpg?resize=150%2C150&ssl=1culiveগল্পনারীর আত্মকথাশিরীন কাদীরের ‘আমার জীবনের কিছু কথা’ গ্রন্থটি কেবল এক নারীর আত্মজীবনী নয়, বরং তার অতিরিক্ত কিছু। এ আত্মজীবনীর অবশ্যই একটি বিশেষ সামাজিক মূল্য আছে। গ্রন্থটি সাধারণ দৃষ্টিতে একটি পরিবারের বিকাশ ও উন্নয়নের সামাজিক দলিল। বৃহত্তর অর্থে আমাদের সমাজ একটি নবীন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ উত্থান পর্বের ব্যক্তিগত পারিবারিক স্মারক। বিষয়টি পারিবারিক...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University