Sharing is caring!


একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার পিছনে একটি গল্প থাকে। তেমনি এক গল্প হলো এটি। অথবা তারও কিছু বেশি। এই গল্প রূপকথাকে হার মানানো এক অপ্রতিরোধ্য কিশোরের জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার গল্প। ইট পাথরের শহরে কিশোর হারিয়ে বসেছিল নিজেকে। গ্রামের হিমেল বাতাস গায়ে মেখে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নিজেকে খুঁজে পেয়ে বেড়ে ওঠা কিশোরের নাম মোঃ নাজিম উদ্দিন জয়। জন্ম ১৯৯৫ সালে, চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার বাউরিয়া গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে। বাবা ছিলেন একজন রিক্সাচালক। দারিদ্রতাকে জয় করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম এর উপর বিবিএ সম্পন্ন করে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নাজিম উদ্দিন নিজেই স্বীকার করলেন তার জীবন সংগ্রামের কথা। কোন সংকোচ না করে জানালেন তার সংগ্রামী জীবনের কথা।
নাজিম উদ্দীনের পিতা মোঃ জামাল উদ্দীন রিক্সাচালাতেন ঢাকা শহরে। পরিবারও থাকতেন ঢাকায়। মা রহিমা বেগম চেয়েছিলেন একমাত্র ছেলে নাজিম উদ্দিন তার নানা মামাদের মত আলেম হবে। ভর্তি করিয়েছিলেন একটি মাদরাসায়। সেখানকার প্রতিকূল পরিবেশ মানিয়ে নিতে না পেরে মাদরাসা থেকে পালিয়েছিলেন অনেকবার। বাসায় ফিরেনি যদি আবার ‘মা’ মারে। কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘুমিয়ে পড়তেন। তারপর পরিবারের লোকেরা খুঁজে নিয়ে যেতেন বাসায়। মাদরাসা পালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশ থেকে বস্তা নিয়ে বের হয়ে কাগজ, বোতল, ক্যান, ইত্যাদি খুঁজতেন। সেগুলো বিক্রি করে দুপুরের খাবার চলে যেত। মাদরাসা থেকে পালিয়েছে তাই বাসায় গেলে তো মা মারবে। কাকতালীয়ভাবে নাজিম যেখান থেকে কাগজ আর বোতল খুঁজতেন সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে ভবিষ্যতের উপার্জন করার উপকরণ নিয়েই আসছেন। রাস্তায় থেকে, রাস্তার ছেলেদের সাথে মিশে যখন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলেন নাজিম।
ঢাকায় বাজে ছেলেদের সাথে মিশে খারাপ হয়ে যাবে ভেবে মা রহিমা বেগম গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে পাঠিয়ে দেন। সেখানে গিয়ে ভাল পরিবেশ আর অনেকগুলো ভালো মানুষের দেখা পেয়ে বদলে যায় নাজিম। ৫ম ও ৮ম শ্রেণি থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখে আসছিলনে। ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় নাজিম বাউরিয়া জিকে একাডেমি থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ+ পেয়ে আবারও চলে আসেন বাবা মায়ের কাছে ঢাকা শহরে। ভর্তি হন বাংলাদেশ কমার্স কলেজে । ২০১২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৯০ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তবে জিপিএ৫ না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়েছিলেন নাজিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারেন নি। রিক্সাচালক বাবা যথাসময়ে টাকার ব্যবস্থা করতে না পারায় ভর্তির সময় চলে যায়। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ফিল্যান্সে ভর্তি হন। ভর্তি টাকাটাও দিয়েছিলেন নাজিমের বন্ধু মোঃ রোবেল ও খালাতো ভাই অহিদুর রহমান। মাস দুয়েক পড়াশুনা ভালোই চলছিলো। এর মাঝে নাজিমের জীবনে নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়। হঠাৎ করে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
বাবাকে অপারেশনও করাতে হয়। নাজিমেরা ৪ ভাই বোন। বড় বোন সদ্য বিবাহিত। ৫ জনের সংসার যেন চলছেই না। নুন আনতে প্রান্তা পুরানোর মত অবস্থা। বাবা অসুস্থ। তার মাঝে ঋণের বোঝা। নাজিম বাধ্য হয়ে হাতে তুলেন তিন চাকার গাড়ি। বাবার রিক্সা সে চালাতে শুরু করলেন। যেখানে পেট চলেনা সেখানে পড়াশুনা আর কিভাবে? নাজিমের জীবন সংগ্রাম শুরু। এর মাঝে ভালো টিউশন পেয়ে গেলেন নাজিম। মেধাবী ছাত্র টিউশনে ভালোই সাড়া পাচ্ছিলেন। কোনভাবে সংসার চলে যাচ্ছে। জগন্নাথের পড়াশুনা আর নিয়মিত করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। এক বছর পর বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেন। দারোয়ানির চাকরি নিলেন। নাজিম আবার পরীক্ষা দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চান্স পেয়ে যান ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বিষয়ে। টিউশন আর বাবার দারোয়ানির চাকরির উপর ভর করে নাজিম অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিবিএ সম্পন্ন করেন। ৫১ তম সমাবর্তনে বাবা মা আর ছোট বোনের সাথে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানালেন তার সংগ্রামী জীবনের কথা।
জানতে চাইলে নাজিম উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমি একটা জিনিস সবসময় বিশ্বাস করি পরিশ্রম আর ধৈর্য মানুষের সফলতা আনতে পারে। আমি সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতাম। আমার আজকের এ অবস্থানে আশার পিছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল আমার মায়ের। এখন স্বপ্ন দেখি বিসিএস এডমিন ক্যাডার হওয়ার। তাহলে অন্তত মা বাবার মুখে হাসি ফুটাতে পারবো।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সভাপতি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক মোঃ ইদ্রিস আলম দৈনিক আজাদী কে বলেন, সন্দ্বীপের মত একটি অজোপাঁড়া গাঁ থেকে একজন ছেলে যেভাবে নিজেকে তুলে এনেছেন এটি সত্যি দৃষ্টান্ত রাখে। যারা এ ধরনের কষ্ট করে পড়ালেখা করে তাদের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও পার্ট টাইম জব থাকলে ভালো হতো। এ ধরনের মেধাবীদের সরকারিভাবে আরও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

Sharing is caring!

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/05/জীবনযুদ্ধে-জয়ী-এক-তরুণের-ঘুরে-দাঁড়ানোর-গল্প.jpg?fit=630%2C644&ssl=1https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/05/জীবনযুদ্ধে-জয়ী-এক-তরুণের-ঘুরে-দাঁড়ানোর-গল্প.jpg?resize=150%2C150&ssl=1culiveগল্পজীবনযুদ্ধেএকজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার পিছনে একটি গল্প থাকে। তেমনি এক গল্প হলো এটি। অথবা তারও কিছু বেশি। এই গল্প রূপকথাকে হার মানানো এক অপ্রতিরোধ্য কিশোরের জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার গল্প। ইট পাথরের শহরে কিশোর হারিয়ে বসেছিল নিজেকে। গ্রামের হিমেল বাতাস গায়ে মেখে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নিজেকে খুঁজে পেয়ে বেড়ে ওঠা...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University