Sharing is caring!

Mehede Ashraf Hasan
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সবচেয়ে দুরত্বের সম্পর্ক বোধহয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সাথে। যারা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা জানে লাইব্রেরীতে ঢুকতে হলে কতটা ধাপে সিকিউরিটির পরীক্ষায় পার হয়ে এখানে প্রবেশ করতে হয়। আপনি আপনার সাথে কোন ব্যাগ কিংবা কোন বই নিয়ে এ নিষিদ্ধ! জায়গায় প্রবেশ করতে পারবেনা না। প্রথমেই আপনার নাম-বিভাগ-আইডি এন্ট্রি করে বইসমেত ব্যাগ জমা রেখে আপনাকে ঢুকতে হবে। এরপর আপনি ধীরে ধীরে দোতালায় উঠবেন। ধীরলয়ে সাইন্স কর্ণার কিংবা সমাজবিজ্ঞান কর্ণারে ঢুকে মুখ যথেষ্ট কাচুমাচু করে বই চাইবেন। তারপর ওদিক থেকে নির্বিকার ভাবে উত্তর আসবে, “যান! আগে কম্পিউটার থেকে বইয়ের নাম-ধাম এন্ট্রি করে নিয়ে আসেন।”
আপনি আবার কম্পিউটার রুমের দিকে পা বাড়াবেন। মোটামুটি লাইনে দাড়িয়ে আপনি কম্পিউটারে ক্যাটালগ অনুসারে খুজেঁ বইয়ের সিরিয়াল জেনে নিবেন। তারপর সেটার কপি এনে লাইব্রেরীতে নিয়োজিত কর্মচারীকে দিবেন। সে বই এনে দিবে। না! আপনার নিজের খোঁজার কোন অধিকারই নেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারকে বলা হয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরী , যেখানে দুষ্প্রাপ্য নথি থেকে শুরু করে মহামূল্যবান কালেকশন রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার নেই নিজের পছন্দের বই খুজে খুজে পড়ার কিংবা আপনি হয়তো এসেছেন Economy-Wide Modeling of Water at Regional and Global Scales বইটা খুজেঁ পান কিনা দেখতে। অথচ তার আগেই পেয়ে গেলেন Global Crisis and Reproduction of Capital, হয়তো এটাতেই আপনি আপনার কাঙ্খিত তথ্যটি পেয়ে গেলেন।
চবির লাইব্রেরীতে কোন বইয়ের কোন চ্যাপ্টার কিংবা আংশিক প্রয়োজন হলে আপনাকে ওখানে নিযুক্ত কর্মচারীদেরকেই দায়িত্ব দিতে হবে। সেটা বেশি দাম দিয়ে হলেও। তাছাড়া ঐ ফটোকপি সাথে সাথে পাবেন না। কখনো সখনো তারা এক-দুই সপ্তাহও লাগিয়ে দেয়। আর সবচেয়ে পেইনফুল পার্ট যেটা সেটা তাদের মুখে আকা বিরক্তির ছাপ। তৎক্ষণাৎ মনে হবে আপনি হয়তো বড় ধরনের কোন বোকামি করে ফেলেছেন এই আবদার! টা করে।
চবির লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে বাসায় নিয়ে পড়বেন? স্বপ্নেও ভাবতে যাবেন না। অন্তত আমাদের সময় তা ছিলো কল্পনালোকের অলীক বস্তু। এখন কি অবস্থা তা সঠিক জানিনা। তবে বিষয়টি অনেকটাই অনুমেয়! কেন ভাই কারও যদি বাসায় এনে দীর্ঘক্ষণ ধরে স্টাডি করতে ইচ্ছে করে তাহলে আনতে পারবে না কেন? সিকিউরিটির নাম দিয়ে আমরা যে গলা ফোলায় অথচ কর্তৃপক্ষ চাইলে খুব সহজেই ছাত্রছাত্রীদের আইডি কার্ডের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা করে দিতে পারতো। মোদ্দাকথা হলো সদিচ্ছার অভাব।
লাইব্রেরীতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একত্রে বসে স্টাডি করার কথা। কোন বিষয়ে সমস্যা হলে ওখানে বসেই আলোচনা করা। শিক্ষকের কোন রিসার্চের প্রয়োজনে হয়তো অনেক বই ঘাটতে হতে পারে, উনার ছাত্রছাত্রীরা হয়তো উনাকে এ কাজে কিঞ্চিৎ হেল্প করতে যেয়ে নিজেরাই একটি উদ্ভাবনী শক্তির সাথে নতুনভাবে পরিচিত হলো। অথচ আমাদের শিক্ষকেরা লাইব্রেরীতে যাওয়ার চাইতে শিক্ষক সমিতির অফিসে বা ক্লাবে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করেন। চবির লাইব্রেরীতে এ ধরনের গবেষণামূলক পরিবেশ চিন্তা করাটাও এখানকার শিক্ষার্থীদের জন্য অপরাধ।
এবার আসি লাইব্রেরীর সময় নিয়ে। খাতা কলমে সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ অনেকটাই যৎসামান্য। এখানকার অনেক স্টুডেন্টই লাইব্রেরীর এ বাধাধরার নিয়মে ত্যক্তবিরক্ত! অথচ লাইব্রেরীতে শিক্ষার্থীদের অবাধ যাতায়াতের পরিবেশের পাশাপাশি অনেকটা সময় নিয়ে ওখানে বসে স্টাডি করার কথা।
দ্য লাইব্রেরি অব পারগামাম!
খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে আত্তালিদ রাজবংশ তুর্কিতে এটি তৈরি করেছিল। দ্য লাইব্রেরি অব পারগামামে অন্তত বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় ২০০,০০০ পৃষ্ঠার এক বিশাল সংগ্রহ আছে।
অনেক শিক্ষাবিদগণই বলে থাকেন যে আধুনিক বিশ্বে তুর্কিদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই লাইব্রেরীটি ঋষির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আছে।
পৃথিবীর উন্নত সবগুলো দেশেই লাইব্রেরীকে ঋষির পর্যায়ে স্থান দিয়ে রেখেছে। আর আমরা সেখানে লাইব্রেরীতে ঢুকতেই নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে দিচ্ছি।
শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরী কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে ওরকম তাত্ত্বিক জ্ঞান কিংবা গবেষণামূলক পড়াশোনা না হলেও প্রতিদিন ওখানকার এন্ট্রি লাইন দেখে এতটুকু অনুমান করা যায় ওরা অন্তত ওদের মনের মত করে ওখানে পড়াশোনা করতে পারে। চবির মত এত বিধিনিষেধের বেড়াজাল নেই। এজন্য চাকরির বাজারে (আমি বলছিনা আমাদের দেশে চাকরির জন্য যে পড়াশোনা করতে হয় তা গবেষণামূলক। এখানে এ তর্ক নিতান্তই অবান্তর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেকাংশে এগিয়ে আছে এখানকার শিক্ষার্থীদের চেয়ে। এটাতেই বা কম আনন্দ কি!!!
খুব বেশিদূরের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবোনা। একবার পাশের দেশ ভারতের কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। ওটা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় অবস্থিত। কুষ্টিয়া জেলার সীমান্ত থেকে মাত্র ২৪ কিমি দূরে। ওখানকার লাইব্রেরীর পরিবেশ দেখেয় মনটা জুড়ে গেল। লাইব্রেরীর এক কর্ণারে ক্যাফেটেরিয়ায় গরম গরম চা-সিঙ্গারা হচ্ছে। কয়েকজন মিলে খুবই পরিমিত ভাষায় সাহিত্য আড্ডা দিচ্ছে। কেউ কেউ বাদ্যযন্ত্র সেগমেন্টে যেয়ে তন্ময় হয়ে যন্ত্রের কলাকৌশল গুলো রপ্ত করছে। আর মূল সেগমেন্টে ওরা নিজেরা হেটে হেটে বই পছন্দ করছে। কি মজার দৃশ্য। সম্ভবত পৃথিবীর ভাললাগার দৃশ্যও বটে। আবার পছন্দনীয় বই নিয়ে বসে যাচ্ছে বিশাল বিশাল টেবিলের এক কোণায়, যেখানে পিনপতন নিরবতা। পুরো কর্মদিবসে সবচেয়ে মুখরিত অথচ সুসজ্জিত জায়গা মনে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী অংশটি। আহা কি মধুর দৃশ্য!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা এত কিছু নিয়ে আন্দোলন করে, ক্যাম্পেইন করে, ভিসিকে স্মারকলিপি দেয় তারা কি কখনো পারেনা একবার আমাদের গর্বের এই লাইব্রেরীটাকে ঢেলে সাজানোর জন্য এক হতে? কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে? ভিসি স্যার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারদের যদি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায় আশাকরা যায় উনারা দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরীমূখী করে তুলতে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সেই সময়টা আছে কি?

Sharing is caring!

https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/02/magdalene_college_library.jpg?fit=1024%2C551&ssl=1https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2019/02/magdalene_college_library.jpg?resize=150%2C150&ssl=1Farhana Mimশিক্ষাচবি লাইব্রেরীMehede Ashraf Hasan চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সবচেয়ে দুরত্বের সম্পর্ক বোধহয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর সাথে। যারা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা জানে লাইব্রেরীতে ঢুকতে হলে কতটা ধাপে সিকিউরিটির পরীক্ষায় পার হয়ে এখানে প্রবেশ করতে হয়। আপনি আপনার সাথে কোন ব্যাগ কিংবা কোন বই নিয়ে এ নিষিদ্ধ! জায়গায় প্রবেশ করতে পারবেনা না। প্রথমেই...#1 News portal of Chittagong University