******গিয়েছিলাম রাঙ্গামাটি**********

মানুষের জীবনের কিছু কিছু দিন,সময়,মুর্হুত থাকে। যা মানুষ সারা জীবন মনে রাখে,তেমন একটা দিন ৮ই অক্টোবর রোজ শনিবার।প্রতিদিনের মত সেই দিন ও সকাল হয়,ঘুম ভাঙ্গল মোবাইলের কাঁপা কাঁপি শব্দ দিয়ে,মনে করছিলাম মেসেজ আসছে,পরে দেখি কল আসছে। গতরাতে তো শফিকে রাঙ্গামাটি যাব বলছিলাম, সেই কল দিয়েছে,আমি কল ব্যাক করলাম। গোসল এবং হালকা করে নাস্তা করলাম,আমি কোথাও যাওয়ার আগে কিছু খেতে পারি না, তবু জোর করে খেলাম।আমার এমনটা জ্বর/পরিক্ষার সময় প্রায় হয়, জোর গলদকরণ করি। সকাল সকাল গাড়ী করে অক্সিজেন যেতে লাগলাম,মনে মনে ভাবতে লাগলাম,যাদের সাথে যাব তাদের কাউকে তো চিনি না, তারা আমাকে কিভাবে নেবে। অক্সিজেন পৌছার পর দেখলাম সব পরিচিত এবং প্রায় মুখ। অক্সিজেন থেকে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যের যাত্রা শুরু করলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম,রাঙ্গামাটি নিয়ে কোন গান কবিতা আছে কিনা, হ্যাঁ মনে পড়ল জনপ্রিয় একটা গান আছে,
“”লাল পাহাড়ের দেশে যা
রাঙ্গামটির দেশে যা
ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে
ইক্কেবারে মানাইছে না রে
লাল পাহাড়ি দেশে যাবি
হাঁড়ি আর মাদল পাবি
মেয়ে মরদের আদর পাবি রে
ও নাগর… ও নাগর…
ইক্কেবারে মানাইছে না রে।””
আমাদের গাড়ী চলতেছে,হঠাৎ রাংগুনিয়া কলেজের গেইটের সামনে গাড়ী থামল। সেখানে শাহাদাত ভাই,আকতার,শফি,ইব্ররাহিম,আমিন রাজিব, বাপ্পু,সেলফি তুলো এবং পরে জানলাম রাংগুনিয়া কলেজের গেইটের সামনে একজন পরিচিত ছেলের সাথে দেখার করার জন্য গাড়ী থামছে। আবার গাড়ী যাত্রা শুরু করল, কে যেন বলে উঠল ড্রাইবর সাহেব গান চালু করেন না? গান চালু করতে
হাসন রাজার গান বাজঁতে লাগল:

“”ও শ্যাম রে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম
এই নিঠুর বনে
আইজ পাশা খেলবো রে শ্যাম
একেলা পাইয়াছি হেতা পলাইয়া যাবে
কোথায় ।।””
হাসন রাজার গান শেষ হওয়ার পর পর কাজী নজরুলের “ধমকেতু” কবিতা বাঁজতে লাগল:
আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ
মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত— সাত শ’ নরক-জ্বালা জ্বলে মম
ললাটে,
মম ধূম-কুণ্ডলী ক’রেছে শিবের
ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে!
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-
তাপ-হাহাকার—
আর মর্ত্তে সাহারা-গোবী ছাপ,
আমি অশিব তিক্ত অভিশাপ!””
খুব ভালো লাগতেছিল শুনতে গান গুলো। গাড়ী “ঝুম রিস্তুরেন্টের সামনে এসে থামল, টিকেট কেটে সবাই ভিতরে ডোকলাম, ভিতরে লোকজন কম সেনাবাহিনীরা কাজ করতে দেখলাম, সেখানে সেলফি এবং ছবি তুলে বের হয়ে গেলাম। ড্রাইবর সাহেব গাড়ীর চালু করলেন, গাড়ীর মধ্যে মিজান এবং ইব্ররাহিম ভাইকে নিয়ে সবাই মজা করতে লাগল। তারা ও মজার মজার কথা বলে বিনোদন দিতে লাগলেন, কিছু রাগ অভিমান এইভাবে চলতে লাগলো। গাড়ী নেভী পুলে ডোকে গেল, খুব সুন্দরভাবে সাজানো গুছানো একটা এরিযা,এখানে নৌবাহিনীরা জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এক জায়গায় গিয়ে সবাই নামলাম ছবি তুললাম,আবার গাড়ী চলা শুরু করল। কিছুর দুুর যাওয়া পর গেইটে গাড়ী থামল, একজন সেনার সদস্য বল কোথায় যাবেন, রাঙ্গামাটি যাব। সেনার সদস্য বলল এই দেখে তো যাওয়া যায় না, ঐ দিকে একজন বলল যাওয়া যাবে। তিনি বললেন এই দিকে যেতে হলে গাড়ী মাথায় নিতে হবে, নিতে পারবেন,মানে নৌকায়। গাড়ী ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে ডাইব্রর রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রাওনা দিল,কাপ্তাই হ্রদ ফেলে গাড়ী চলতে লাগল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রাস্তার দুই ধারে বন এবং নদী বা খাল। কিছু সময় পর মনে হচ্ছে গাড়ী পাহাড়ের উপরে উঠা নামা করছে। দুই ধারে বিশাল খাত ড্রাইবর একটু অসবধান হলে নির্ঘাত মৃত্যু। পাহাড়ের সাথে মেঘের এত প্রেম পুর্বে দেখিনি,একটা আবরণ ধারা পাহাড়কে জড়িয়ে আছে।যা প্রকৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা ”
সেই গল্পটা” মনে পড়ল:

আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি
শোন,পাহাড়টা, আগেই বলেছি
ভালোবেসেছিল মেঘকে
আর মেঘ কিভাবে শুকনো খটখটে
পাহাড়টাকে
বানিয়ে ফেলেছিল ছাব্বিশ বছরের
ছোকড়া।
সে তো আগেই শুনেছো
সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন
পাহাড় মেঘকে বলল, আজ তুমি লাল
শাড়ি পড়ে আসবে
মেঘ পাহাড়কে বলল, আজ তোমাকে
স্নান করিয়ে দেব চন্দন জলে
ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায়
নরোম নদী
পুরুষরা জ্বলন্ত কাঠ।
সেইভাবেই সেইভাবেই মেঘ ছিল
পাহাড়ের আলিঙ্গনে।।।
উচু নিচু রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ী চলতে লাগল, মাঝে মাঝে গাড়ী থেকে নেমে সেলফি ছবি তুললাম। আমাদের গাড়ী রিজার্ভ বাজারে গিয়ে থামলে, সেখানে সাইফুল,আদনান ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল,একটা মসজিদে গিয়ে সবাই অজু করে মসজিদে ডোকলাম। মসজিদ থেকে বের হয়ে একটা হোটেলের ভিতরে সেলিম ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম,সেলিম ভাই আসার পর সবাই দুপুরের খাবার খেলাম। সাইফুলকে সুভালং জলপ্রপাত যাবার জন্য একটা স্টিমার ভাড়া করে রাখতে বলে ছিলেন। আমরা সবাই স্টিমারে উঠলাম, আমার মনে মনে খুব ভয় লাগতে ছিল,আমি শুধু নিচে বসেছিলাম, বাকি সবাই স্টিমারের উপরে নিচে আসা যাওয়া করছে,সেলফি এবং DSLR ক্যামরা দিয়ে ছবি তুলে দিচ্ছে মোরশেদ ভাই। আমি স্টিমারে বসে বসে চারপাশ দেখতে লাগলাম,চারপাশে পানি এবং পানি। স্টিমারের দুরে দুরে পাহাড় চারপাশে পাহাড় গুলো পুকুরের পাড়ের মত মনে হচ্ছে। নদীর মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপের মত পাহাড় এবং বড় গুলোর মধ্যে হোটেল করা হয়েছে। লোকজন ছোট ছোট নৌকা দিয়ে মাছ ধরতেছে। বরকল উপজেলার আসার আগে আগে দেখলাম বিশাল পাহাড়ের চূর্ড়ায় গৌতম বুদ্ধ মুত্তি, হাত তুলে স্বাগতম জানানো মত দাঁড়িয়ে আছে। বইয়ে পড়ছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে প্রবেশের পথে স্ট্যাচু অব লিবার্টি মানুষকে স্বাগতম জানানোর মত দাঁড়িয়ে আছে। বরকল উপজেলায় প্রবেশ করে দেখলাম ছোট ছোট অনেক গুলো ঝর্ণা,অবশ্যাই পাহাড়ে লতাপাতার জন্য ভালো করে দেখা যাচ্ছে না।সুভালং জলপ্রভাতে পৌঁছলাম, প্রতিজন ১৫ টাকা করে টিকেট কাটলেন সাইফুল ভাই। অনেক উচু থেকে হালকা হালকা পানি পড়তেছে, যদি ও এটা নায়গ্রা জলপ্রপাতের কাছে এক ফোঁটা পানির মত মনে হবে,যদি ও নায়গ্রা জলপ্রপাত টিভিতে দেখেছি। তবু খুব সুন্দর লাগতেছে,অনেক উচু থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পড়তেছে। সবাই সেলফি এবং ছবি তুলার মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আর মনে মনে ভাবতেছি সরকার বা প্রশাসন এটা সংস্কার করলে, বড় পযর্টন খাত হিসাবে গড়ে উঠবে। এই জলপ্রপাত ছেড়ে স্টিমারে করে অন্য একটা জলপ্রপাতে গেলাম। আমিন এবং মোরশেদ ভাই আমরা তিন ছাড়া বাকি সবাই পানিতে নেমে গেল,ঝর্ণার পানিতে গোসল করল সেলফি ছবি তুলো, সবাই খুব মজা করেছে। এইবার কূলে ফেরার পালা, সবাই স্টিমারে উঠে পড়ল। বরকলি উপজেলা পার হওয়ার সময় দেখলাম পাহাড়ের চূড়ায় নতুন একটা গৌতম বুদ্ধ মুত্তি তৈরী করার হচ্ছে,আগের মুত্তি বিপরীত মুখ করে।উচু উচু দুই পাহাড়ে দুইটি মুত্তি একটা পযর্টকদের আমাতন্ত্রণ জানায়,অন্যটি বিদায় জানানো মত করে। কেউ কেউ গৌতম বুদ্ধ মুত্তি দেখার জন্য গেল পাহাড়ের চূড়ায় গেল, স্টিমার চালক বললেন আকাশে মেঘ করতেছে,তাড়াতাড়ি চলে গেলে ভালো হয়। সবাই উঠলে স্টিমার চালু করলেন, কিছু দুর যাওয়ার পর বৃষ্টি শুরু হল, একটু একটু করে শান্ত নদী অশান্ত হয়ে উঠল। দ্বীপর মত একটা জায়গায় স্টিমার থামল,যেখানে একটা হোটেল আছে। মোরশেদ ভাই মজা করে বললেন বাড়ীতে সবাই শেষ কথা বলে নাও,সেলিম ভাই বাড়ীতে কল দিয়ে কথা বললেন। হালকা হালকা অন্ধকারের কারণে রাজিব মজা করে,মোবাইলে আলো দিয়ে এক একজনকে একরকমের কথা বলতে লাগলেন। বৃষ্টি থামার পর স্টিমার চালু করলেন,আমরা কুলে পৌঁছতে পৌছতে অন্ধকার হয়ে আসলো। কবি জীবনান্দ দাশ সুন্দর করে বলেছেন “বনলতা সেন” কবিতায়:
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের
শব্দের মতন
সন্ধা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ
মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে
পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে
ঝিলমিল।।
রিজার্ভ বাজার আসার পর সবাইকে সাইফুল ভাই তার বাসায় নিয়ে গেলেন,অনেক নাস্তার ব্যবস্থা ও করলেন। নাস্তা করে বাড়ী পথে রওনা দিলাম,পথে অনেকের রাঙ্গামাটির পরিচিত মুখের সাথে সাক্ষাত করলেন। কবিতা লাইন দিয়ে শেষ করি:
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-
ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি
বসিবার বনলতা সেন।।
সুন্দর আয়োজনের জন্য সবাই কে ধন্যবাদ।।
মো: মনজুরুল ইসলাম (রানা)
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

monju ranaBlogট্যুরব্লগপ্রকৃতির লিলা ভূমি,রাঙ্গামাটি,সুভালং জলপ্রপাত******গিয়েছিলাম রাঙ্গামাটি********** মানুষের জীবনের কিছু কিছু দিন,সময়,মুর্হুত থাকে। যা মানুষ সারা জীবন মনে রাখে,তেমন একটা দিন ৮ই অক্টোবর রোজ শনিবার।প্রতিদিনের মত সেই দিন ও সকাল হয়,ঘুম ভাঙ্গল মোবাইলের কাঁপা কাঁপি শব্দ দিয়ে,মনে করছিলাম মেসেজ আসছে,পরে দেখি কল আসছে। গতরাতে তো শফিকে রাঙ্গামাটি যাব বলছিলাম, সেই কল দিয়েছে,আমি কল ব্যাক...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University