ড.জামাল নজরুল ইসলাম  এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

dr. jamal nazrul
Dr. Jamal Nazrul

জন্ম: ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলায়।
তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের অধ্যাপক,শাবিপ্রবির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য,চুয়েটের সিন্ডিকেট সদস্য,এবং চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত Researsch centre for mathematical & physical centre এর ডিরক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন৷৷
তাঁর বাবা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম সে সময়ে বৃটিশ ভারতের মুন্সেফ ছিলেন (বর্তমানের সহকারী জজ সমতুল্য)। তাঁর বয়স যখন এক বছর, সে সময় তাঁর বাবার বদলির সুবাদে কলকাতায় চলে যান তাঁরা৷৷
শৈশবের অনেকখানি সময় কেটেছে কলকাতায়। প্রথমে কলকাতার একটা মডেল স্কুলে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। এরপর ভর্তি হন শিশু বিদ্যাপীঠে। ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়লেন এখানে। এরপর আবার মডেল স্কুলে চলে যান৷কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসে ভর্তি হলেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। মেধা পরীক্ষায় তাঁর কৃতিত্ব দেখে কর্তৃপক্ষ ডাবল প্রমোশন দিয়ে তাঁকে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে নিলেন। এ কারণে তখনই অনেকের নজর কেড়েছিলেন তিনি। এখানে পড়লেন নাইন পর্যন্ত। এখানে পড়ার সময়ই গণিতটা ভালো লাগতে শুরু করে তাঁর। এ সময়ে তিনি নিজে নিজেই প্রচুর জ্যামিতি করতেন। নবম শ্রেণীতে উঠে চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানের মারিতে, ভর্তি হলেন একটি বোর্ডিং স্কুলে, নাম লরেন্স কলেজ। সে সময় ওখানে মেট্রিকুলেশন ছিল না। মেট্রিকুলেশনকে বলা হতো সিনিয়র কেমব্রিজ (এখনকার ও লেভেল)। ওটা পাস করলেন জামাল নজরুল ইসলাম। তারপর হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ (এখনকার এ লেভেল) পাস করলেন। হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজে ম্যাথমেটিক্স পড়েছিলেন কেবল তিনি একাই। ওটা ছিল অ্যাডভান্স পর্যায়ের ম্যাথ। এরপর যখন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এসসি. অনার্স করে পড়তে গেলেন কেমব্রিজে ততদিনে গণিতের প্রতি তাঁর দুর্বলতা তৈরি হয়ে গেছে। কেমব্রিজে গিয়ে আবারও গ্রাজুয়েশন করলেন, ট্রিনিটি কলেজ থেকে। তিন বছরের ম্যাথমেটিকাল ট্রইপস কোর্স ২বছরে শেষ করে সবার নজর কাড়ন৷৷ওখানেই এম.এ. করলেন। কেমব্রিজ থেকেই ১৯৬৪ সালে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা বিষয়ের ওপর পিএইচডি করলেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে ডি.এসসি. (ডক্টর অব সায়েন্স) ডিগ্রিও অর্জন করেন।

তিনি ১৯৬৭-১৯৭১ পর্যন্ত Institute of Theoritical Astronmy (cambridge) এ পরবর্তিতে California Institute of Technology, University of Washington এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন৷৷১৯৭৩-১৯৭৪ সালে king’s College London এ কর্মরত ছিলেন৷৷
১৯৭৮ সালে City University London এ যোগদেন৷
১৯৮১ সালে কেমব্রিজের সোয়া লাখ টাকা বেতনের অধ্যাপনার চাকরীটি ছেড়ে দেশে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন৷ তখন ভিসি ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. করিম। তিনি তাঁকে তিন হাজার টাকার একটি বিশেষ বেতন-কাঠামোয় নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সিন্ডিকেট তাতে কিছুতেই রাজি হয় নি। তারা বেতন প্রস্তাব করল আটাশ শ টাকা। এক বছর পর বিশেষ পারিবারিক কারণে কিছুদিনের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ছুটি দিচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যান। দুবছর পরে, ১৯৮৪ সালে, তিনি ওখানকার বাড়ি-ঘর সব বিক্রি করে দিয়ে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দয়াপরবশ হয়ে তাঁর বেতন তিন হাজার টাকায় উন্নীত করতে সম্মত হন এবং মাঝখানের দুবছরকে শিক্ষাছুটি হিসাবে গণ্য করেন।৷৷
শুধু নিজে নয়, তাঁর প্রিয় সবাইকেই তিনি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশের আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও কল্পবিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরার আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করামাত্র তিনি তাঁকেও দেশে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, ড. ইসলাম যদি বিদেশে থেকে যেতেন তাহলে নিশ্চিত নোবেল পুরস্কার পেতেন।৷৷
অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বিশাল। যার মধ্যে রয়েছে তাত্ত্বিক কণা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষ তত্ত্ব, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, আইনষ্টাইন ম্যাক্সওয়েল সূত্র, নক্ষত্রের গঠন, মহাবিশ্ব তত্ত্ব অন্যতম। মহাবিশ্বের ভবিষ্যত বা অন্তিম পরিণতি নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধে ড. জামাল নজরুল মহাবিশ্ব যেসব সময় প্রসারিত হবে সে রকম একটি ধারণার কথা বলেন যা বিজ্ঞান বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি অংক কষে দেখিয়েছেন আগামী ১০০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে আমাদের গ্যালাক্সি অর্থাৎ মিল্কিওয়ের সব তারার মৃত্যু হবে।৷৷

jamal nazrul speech

দিনের অনেকটা সময় কাটত তাঁর বইয়ের সঙ্গে আর লেখালেখি করে। অনেক আগে থেকেই লেখালেখি করেন তিনি। তবে মহাবিশ্বের পরিণতি কী হতে পারে বা কী হবে, এই জটিল বিষয়টা নিয়ে লেখা তাঁর ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ (মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি) বইটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে ১৯৮৩ সালে প্রকাশ হওয়ার পর বিজ্ঞানী মহলে বেশ হই চই পড়ে যায়। বইটি পরে জাপানি, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, পর্তুগিজ ও যুগোস্লাভ ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালে W B Bonnor-এর সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন ‘ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি’ এবং ১৯৮৫ সালে ‘রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস তাঁর তিনটি বই প্রকাশ করেছে। তিনটি বইই কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডসহ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। তবে এসব বইয়ের তুলনায় তাঁর বাংলায় লেখা বইগুলোকে কোনো অংশে কম মনে করেন না তিনি। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ বিবর’ (ব্ল্যাকহোল) এবং রাহাত-সিরাজ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ ও ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ নামক বইগুলি তাঁর লেখা অন্যান্য বইয়ের মধ্যে অন্যতম। শেষোক্ত বই দুটি মূলত সংকলন। এ ছাড়াও তাঁর দুটি জনপ্রিয় আর্টিকেল আছে। একটি হলো ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ’। পরে এটির স্প্যানিশ সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি হলো ‘দ্য ফার ফিউচার অব দ্য ইউনিভার্স, এনভেডর’। এই আর্টিকেলটি জার্মান, ডাচ ও ইতালিয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তাঁর লেখা গবেষণাপত্রের সংখ্যা প্রায় ৬০। নিজের গবেষণা প্রবণতা সম্পর্কে বললেন, ‘কোনো বিষয়ে গবেষণা করে ব্যর্থ হলে বা শেষ হলে সেটাকে একেবারে ছেড়ে দিইনি। আবার তাতে ফিরে এসেছি। আবার সেটা নিয়ে গবেষণা করেছি। এভাবে গবেষণা করতে আমার ভালো লাগে।’ তিনি মনে করেন একটা বিষয়ে বারবার চেষ্টা করলে বিষয়টি আস্তে আস্তে আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজকে তাঁর গবেষণার সূতিকাগার হিসেবে স্মরণ করেন এখনো। ড. নজরুলের তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত প্রায় দশজন পিএইচডি ও প্রায় আটজন শিক্ষার্থী এম.ফিল. ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির এবং কেমব্রিজের শিক্ষার্থী রয়েছেন দুজন।
তিনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল এস্ট্রোনমির স্টাফ মেম্বার ছিলেন। তিনি লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে আরম্ভ করে আমেরিকার প্রিন্সটন ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিসহ (Princton Institute for Advanced Study ) (যেখানে Einstin তাঁর শেষ বিশ বছর কাটিয়েছিলেন) অনেক খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাষক, ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট বা মেম্বার হিসেবে কাজ করেছেন।৷৷

একজন বিজ্ঞানীর রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা এবং ছবি আঁকার সংবাদে যদি কেউ বিস্মিত হন তো নিশ্চিত এই খবরে তিনি আরো অবাক হবেন যে, কম্পিউটার জিনিসটার প্রতি জামাল নজরুল ইসলামের কোনো আগ্রহ নেই। তাঁর বাড়িতে কোনো কম্পিউটার নেই। সুতরাং ইন্টারনেট সংযোগ থাকারও প্রশ্ন আসে না। জিনিস দুটিকে তিনি রীতিমতো অপছন্দই করেন। কারণ জানাতে গিয়ে বললেন, ‘কম্পিউটারে অনেক কাজ করা যায় বটে, তবে সব নয়। আর কম্পিউটারে করার দরকারই বা কী? আমার কাজের জন্য কম্পিউটার দরকার হয় না। আমি জীবনে কখনো ক্যালকুলেটর ব্যবহার করিনি। এই বিষয়ে আমি গর্বিত নই, লজ্জিতও নই। মাথা খাটিয়ে করলেই তো হয়। তাতে মস্তিষ্কের চর্চাও হয়, নিজে নিজে করাও হয়।’
দেশে ফিরে বিজ্ঞানের উন্নয়নের জন্য অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। শুধু বিজ্ঞানেই তাঁর অবদান ছিল না, তিনি কাজ করেছেন দারিদ্র দূরীকরণে, শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছেন। তিনি মনে করতেন, আমাদের দেশটা যেহেতু কৃষিনির্ভর, তাই, আমাদের শিল্পনীতি হওয়া চাই ‘কৃষিভিত্তিক, শ্রমঘন, কুটিরশিল্প-প্রধান’ এবং ‘প্রধানত দেশজ কাঁচামাল-নির্ভর’। তিনি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ-এর ক্ষতিকারক প্রেসক্রিপশন বাদ দিয়ে নিজেদের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা সুষ্ঠু শিল্পনীতির প্রতি সবসময় গুরুত্ব দিতেন।

পাশ্চাত্য সাহায্যের ব্যাপারে তার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে –
‘তোমরা শুধু আমাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াও, আমাদের ভালোমন্দ আমাদেরকেই ভাবতে দাও। আমি মনে করি, এটাই সর্বপ্রথম প্রয়োজনীয়।’

অনেকে আছেন যারা বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার কথা শুনলেই নাক সিটকান। ভাবেন, উচ্চতর গবেষণা হতে পারে কেবল ইংরেজিতেই। জামাল নজরুল ইসলাম সেধরণের মানসিকতা সমর্থন করতেন না। আমি যে উপর বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ বিবর’ বইটার উল্লেখ করেছি, তার বাইরেও তিনি বাংলায় আরো দুটো বই লিখেছেন। একটি হল ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ এবং ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ । দুটি বই-ই রাহাত-সিরাজ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত। বইগুলো বাংলা ভাষা এবং বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার উপর অনুরাগ তুলে ধরে। পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত একটি কলামে তিনি বলেছেন,
“অনেকের ধারণা, ভাল ইংরেজি না জানলে বিজ্ঞানচর্চা করা যাবে না। এটি ভুল ধারণা। মাতৃভাষায়ও ভাল বিজ্ঞান চর্চা ও উচ্চতর গবেষণা হতে পারে… বাংলায় বিজ্ঞানের অনেক ভাল বই রয়েছে। আমি নিজেও বিজ্ঞানের অনেক প্রবন্ধ লিখেছি বাংলায়। এদেশে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেন এমন অনেকেই বাংলায় বই লিখেছেন এবং লিখছেন। তাদের বই পড়তে তেমন কারও অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয় না। সুতরাং বাংলায় বিজ্ঞানচর্চাটা গুরুত্বপূর্ণ।”
. জামাল নজরুল ছিলেন একের ভিতর অনেক। তিনি ভালো গাইতে পারতেন, বাজাতেন পিয়ানো ও সেতার। আবার ছবি আঁকতেও খুব পছন্দ করতেন। বিজ্ঞানের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি কাজ করেছেন দারিদ্র্য দূরীকরণে এবং শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়নে। পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি হিসাবে দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম নগর ও পরিবেশ উন্নয়নে স্ট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম করে গেছেন।৷৷

এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন,
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান হতাশাজনক অবস্থা সত্ত্বেও আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আমার এই আশাবাদের ভিত্তি আমাদের জনগণ। আমাদের অত্যন্ত পরিশ্রমী, সৎ ও মানবিকতায় ভাস্বর একটা বৃহৎ সাধারণ জনগোষ্ঠী আছে। এদের ওপর আমি পরিপূর্ণ ভরসা রাখি। আমার বিশ্বাস, এই জনগোষ্ঠী থেকেই একদিন প্রকৃত নেতৃত্বের উত্থান হবে যা আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সত্যিকারের মুক্তির পথে।

জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৭১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে পাক হানাদারদের আক্রমণ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন। সারাদিনের নানা রকম কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর মাথায় ঘুরে ফিরে আসে দেশের চিন্তা। তিনি কয়েকজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার খরচ যোগান। তিনি মনে করেন, আমরা সবাই যদি দেশ নিয়ে ভাবি তাহলে হয়তো দেশের এই অবস্থা থাকবেনা।
১৯৬০ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি সুরাইয়া ইসলামের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই মেয়ে। বড় মেয়ের নাম সাদাফ সাজ সিদ্দিকি আর ছোট মেয়ের নাম নার্গিস ইসলাম।
তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন জোসেফসন, অমর্ত্য সেন এবং স্টিফেন হকিং। দেশ, জাতি বা বয়সের বিভেদ তাঁদের বন্ধুত্বের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জ্ঞানচর্চার সূত্রে একই সমতলে নেমে এসেছেন তাঁরা। হকিং বয়সে তাঁর চেয়ে দুই বছরের ছোট। ১৯৬৭ সালে জামাল নজরুল ইসলাম কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে কাজ শুরু করেন (১৯৬৭ থেকে ১৯৭১)। হকিং পরে এসে সেখানে যোগ দেন। তাঁরা দুজন দুজনের কাজ সম্পর্কে জানতেন। তবে তাঁরা একসঙ্গে কোনো পেপার লিখেননি। কথা হতো দুজনের মধ্যে। লন্ডনে থাকতে হকিং বহুবার তাঁর বাড়িতে এসেছেন। জামাল নজরুল ইসলামও সপরিবারে তাঁর বাড়িতে গিয়েছেন। দাওয়াত খেয়েছেন। দুজনের কাজের প্রতি পরস্পরের আগ্রহ ছিল। হয়তো দেখা গেল জামাল নজরুল ইসলাম কোথাও লেকচার দিচ্ছেন সেখানে হকিং গেছেন তাঁর লেকচার শুনতে বা হকিং কোথাও লেকচার দিচ্ছেন সেখানে জামাল নজরুল ইসলাম গিয়েছেন তাঁর লেকচার শুনতে।
বয়সে হকিং যেমন তাঁর কনিষ্ঠ তেমনি বয়োজ্যেষ্ঠ হলেন অমর্ত্য সেন। ১৯৫৭ সালে তিনি যখন কেমব্রিজ কলেজে পড়তে গেলেন তখন অমর্ত্য সেন ট্রিনিটি কলেজের ফেলো। সে সময়ে অবশ্য তিনি ওখানে ছিলেন না। ১৯৫৯ সালে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় ভারতের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমিয় বাগচীর মাধ্যমে। তারপর পরিচয়টা আস্তে আস্তে গাঢ় হলো। এভাবেই ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। এক সময় অমর্ত্য সেনের পরিবারের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়ে যায় তাঁর পরিবারের। ১৯৯০ সালে অমর্ত্য সেন যখন বাংলাদেশে এলেন তখন চট্টগ্রামে গিয়ে জামাল নজরুল ইসলামের বাড়িতেই ছিলেন।পাকিস্তানের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালামও তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জামাল নজরুল ইসলামের চেয়ে আবদুস সালামের বয়স অনেক বেশি হলেও (তিনি আমার চেয়ে ১৩ বছরের বড়) তাঁর আচরণে কখনো তা মনে হতো না। তিনি সবসময় তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ ব্যবহারই করতেন। কেমব্রিজের ট্রিনিটিতে পড়ার সময় আব্দুস সালামের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়। তিনি সেখানে একটি বিশেষ লেকচার দিতে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম আলাপ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রফেসর আব্দুস সালাম এক সরকারি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে এলেন। তাঁর হাত থেকে জামাল নজরুল ইসলাম একটি পদকও নেন।
অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় ছিল বিখ্যাত মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ফ্রিম্যান ডাইসনের, যার সঙ্গে অনেক নোবেলজয়ী কথা বলার জন্য উদগ্রীব থাকতেন৷ এমনকি নিজের একটি বইয়ে অধ্যাপক ইসলামের নামও উল্লেখ করেছেন ডাইসন৷
আরেক মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান, যাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাঁর সঙ্গেও সখ্যতা ছিল জামাল নজরুল ইসলামের৷

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যে গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন সেখানে মাঝেমধ্যেই কেমব্রিজ থেকে বিখ্যাত লোকজনদের এনে সেমিনার করতেন৷ এভাবে একবার এসেছিলেন ব্রিটিশ গাণিতিক পদার্থবিদ স্যার রজার পেনরোজ, যিনি স্টিফেন হকিং এর সঙ্গে কাজ করেন৷ এসেছেন পাকিস্তানি নোবেলজয়ী পদার্থবিদ আব্দুস সালামও৷৷৷

journal of jamal nazrul

ড.জামাল নজরুল ইসলাম অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি স্বর্ণপদক (১৯৮৫), ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল (১৯৯৪), ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্স অনুষ্ঠানের মেডাল লেকচার পদক (১৯৯৮), কাজী মাহবুবুল্লাহ এন্ড জেবুন্নেছা পদক (২০০০), একুশে পদক (২০০১) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক (২০১১)। এ ছাড়া বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি, রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি, কেমব্রিজ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের সদস্য ছিলেন৷
ফুসফুসের সংক্রমণ ও হৃদরোগজনিত সমস্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ মার্চ ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে মারা যান।

মহাবিশ্বের অধ্যয়ন মোটা দাগে অনন্য এক অভিজ্ঞতা। অন্তত: এক দিক থেকে এটা সামগ্রিকতাকে বোঝার একটা প্রয়াস। আমরা, চিন্তাশীল সত্ত্বার অধিকারীরা নিউট্রন তারকা আর শ্বেত বামনদের নিয়ে গঠিত এই মহাবিশ্বের অংশ, এবং আমাদের গন্তব্য অনুদ্ধরণীয়ভাবে এই মহাবিশ্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
–অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম (The Ultimate Fate of the Universe)

— মোঃ খালেদ মাহমুদ আরমান
গনিত বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়৷৷

আমার লিখার তথ্য সুত্র:
উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা ও ব্লগ৷৷

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2016/09/unnamed.jpg?fit=720%2C508https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2016/09/unnamed.jpg?resize=150%2C150culiveStoryএক্সক্লুসিভক্যারিয়ারগল্পফিচারDr. Jamal Nazrul Islam,অভিজ্ঞতা,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল,ড.জামাল নজরুল ইসলাম,পুরস্কার ও সম্মাননাড.জামাল নজরুল ইসলাম  এর সংক্ষিপ্ত জীবনী জন্ম: ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলায়। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের অধ্যাপক,শাবিপ্রবির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য,চুয়েটের সিন্ডিকেট সদস্য,এবং চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত Researsch centre for mathematical & physical centre এর ডিরক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন৷৷ তাঁর বাবা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম সে সময়ে বৃটিশ ভারতের মুন্সেফ ছিলেন (বর্তমানের...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University