আমি শিরিন আক্তার।যখন এ চিঠিটি লিখতে বসছি তখন বয়সটা মনে করতে পারছি না।তবে ঠিকানাটা মনে আছে।ভূজপুর থানা এলাকার বাগানবাজার ইউনিয়নের দক্ষিন রসুলপুর সাকিনের জুলফু মিয়ার বসতবাড়ীর অনুমান সত্তর গজ পশ্চিমে-দক্ষিণে পাহাড়ী ঢালু সংলগ্ন তালতলায় আমার বসত।ছোট্ট কুঠির।ভালো নেই আমি।অসহ্য যন্ত্রণাপূর্ণ সময় পার করছি।তবে নীতিহীন এ সমাজের অনেক অবলা নারীর চেয়ে বেশ ভালো আছি।বিশেষ কিছু অসুবিধা থাকলেও মানুষের কু-দৃষ্টি ও লালসার বিষাক্ত থাবা থেকে মুক্ত আছি।আমার বয়সী দরিদ্র পরিবারের সুন্দর চেহারার অনেকেই সেটা নাই।

আমার মায়ের নাম বিবি ফাতেমা।দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম।পচিঁশ বছর আগে আমার মায়ের সাথে বিয়ে হয় ভবঘুরে নুরুল করিমের।যিনি আমার মাকে বিয়ে করায় এবং তাদের দু’জনের মিলনের ফসল হিসেবে আমার এ ধরায় আগমন হেতু তিনি আমার পিতাও বটে।যা হোক আমার জৈবিক পিতা নুরুল করিমের সাথে আমার মা বিবি ফাতেমার সংসার চলে দুই বছর।তাদের সংসারের বয়স যখন দেড় বছর,আমি আমার মায়ের গর্ভে ছিলাম।একদিন হঠাৎ করে আমার পিতা নিরুদ্ধেশ হয়ে যায়।আমার মা আমাকে গর্ভে ধরে যেন পাপ করলেন।নানা নানী জীবিত ছিল না।আমার মা খেয়ে না খেয়ে মানুষের ঘরে কাজ করে দিন পার করতে থাকেন।একদিন আমার জন্ম হলো।এই সুন্দর পৃথিবীতে আসলাম।আত্নীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাই আনন্দ করল আমাকে নিয়ে।কিন্তু মা খুশি হতে পারলেন না।পৃথিবীতে আমার আগমন তিনি কিছুতেই মানতে পারলেন না।তার নিরানন্দের কারণ অনেক পরে বুঝেছিলাম।

আমার বয়স যখন মাত্র সতের মাস,মা আমাকে দত্তক দিয়ে দিলেন নিঃসন্তান ফাতেমা বেগমের কাছে। নিজে দু’বেলা খাবার পেটে দিতে সংগ্রাম করেও পেরে উঠতে পারছিলেন না।আমি ছিলাম অতিরিক্ত ঝামেলা।অভাবের সংসারে আমাকে পালন করতে না পারার ভয়েই মা আমাকে দত্তক দেন।মা হয়তো মনে করেছিলেন নিঃসন্তান ফাতেমা ও সুরুজ আমাকে পেট ভরে খাবার টা অন্তত দিবেন।মেয়ের সুন্দর বাচার স্বপ্ন নিয়ে নিজের অস্হিত্বকে কোরবানী দিলেন আমার মা।

ফাতেমা বেগম ও তার স্বামী সুরুজ মিয়া নিজ সন্তানের মতোই আমাকে লালন পালন করতে লাগলেন। আমাকে দত্তক নেয়ার আগে ফাতেমা ও সুরুজের কোন জীবিত সন্তান জন্ম না নিলেও আমাকে দত্তক নেয়ার সাত বছর পর ফাতেমা-সুরুজ দম্পতি নিজেদের ঔরসে সন্তানের দেখা পান।একে একে তারা তিন সন্তানের জনক-জননী হলেন।তবে আমার প্রতি আদর ভালোবাসা এতটুকু কমল না।

আমার বয়স যখন বার/তের বছর,আমার পালক পিতা সুরুজ মিয়া কু-দৃষ্টি দিল আমার উপর।আমাকে অতি স্নেহের ছলে তার বাহুডোরে রাখলেন সবসময়।এ সময় বিধাতার বিধিতে অসুস্হ হয়ে পড়লেন আমার পালক মা ফাতেমা।ফাতেমা বেগম স্বামীর চাহিদা পূরণ করতে পারছিলেন না।সুরুজ তার স্ত্রীর সাথে রাত যাপন করতে না পারায় আমাকেই বেছে নেয় তার যৌন চাহিদা পূরণের বস্তু হিসেবে।পালক মা ফাতেমা দীর্ঘদিন অসুস্হ থাকায় সুরুজের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।সংসার বাচানো ও স্বামীকে কাছে ধরে রাখার জন্য ফাতেমাও সুরুজকে সমর্থন ও সহযোগীতা করে আমাকে ভোগ করতে। জোর করে আমাকে ভোগ করতে থাকে সুরুজ।ভোগ্য পন্য বানিয়ে সময়ে অসময়ে আমার উপর চলতে থাকে যৌন নীপিড়ন।

এদিকে আমার জন্মদাত্রী মা বিবি ফাতেমা দ্বিতীয় বিয়ে করে তাজুল ইসলাম নামের আরেক লম্পটকে।তাজুলের সাথে মায়ের সংসার চলে দশ বছর।তাজুলের ঘরে মায়ের একটি ছেলে হয়।তাজুলের কোন স্হায়ী ঠিকানা নাই।বিভিন্ন জায়গায় সাত/আটটি বিয়ে করে সে।মায়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ হয় আরও দুই বছর আগে।

আমার বয়স যখন উনিশ, আমাকে পালক মা বাবা বিয়ে দেয় নুরুল আমিনের সাথে।প্রবাসী নুরুল আমিনের প্রথম স্ত্রী মারা গেলে আমি নরকযন্ত্রণা থেকে বাচার জন্যই বিয়ে করি নুরুল আমিনকে।আমিন আমাকে বিয়ে করে দুই মাস পর আবারও বিদেশ চলে যায়।আমি শ্বাশুড়ীকে নিয়ে স্বামীর ঘরে থাকি।সুরুজ মিয়া তার লালসা ত্যাগ করতে পারেনি।সে পিতৃ পরিচয়ে আমার স্বামীর ঘরে আসা যাওয়া করতে থাকে।আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে আবারও ভোগ করতে থাকে আমার দেহ।প্রতিবাদ করলেই আমার সংসারে আগুন জ্বালানোর হুমকি দেয়।আমার স্বামীকে সব কথা বলে দিয়ে সংসার ভাঙ্গানোর ভয় দেখায়।একদিকে আমার স্বামীর সংসার,অন্যদিকে সুরুজের ব্ল্যাকমেইলিং ও যৌনাচার।জগতে বেচে থাকার বাসনায় সব কিছু খোলে বললাম স্বামী নুরুল আমিনকে।একপর্যায়ে সব মেনেও নিলেন।সুরুজকে স্হানীয় জনপ্রতিনিধি দিয়ে সতর্কও করানো হলো।আমার স্বামী মাঝখানে একবার দেশ থেকে ঘুরেও গেলেন।এসময় আমার স্বামীর দূঃসম্পর্কীয় এক ভাগিনাও আমার উপর কু-দৃষ্টি দেয়।ছলে বলে কৌশলে সেও আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার দেহ ভোগ করতে থাকে।সে সুযোগটা নিয়েছিল মূলত সুরুজ মিয়ার কু-পরামর্শে।আমার জীবনপ্রবাহটা দূর্বিসহ করে তুলল।

আমার স্বামীর চাপে ব্যভিচারের অভিযোগে মামলা করলাম আদালতে।আসামী সুরুজ মিয়া ও ফাতেমা বেগম।বিশ্বাস করে সবকিছু প্রকাশ করায় এবং সুরুজ মিয়ার কু-মন্ত্রণায় আমার স্বামী আর নিজেকে ধরে ররাখতে পারলেন না।আর মেনে নিলেন না।শুরু হলো নির্যাতন।স্বামীর অশুভন ও কটু আচরন আর সুরুজের যৌন অনাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য চলে গেলাম পালক মা ফাতেমার পিতা জুলফু মিয়ার ঘরে।স্বামী ছাড়া জন্মদাত্রী দরিদ্র মায়ের ঘরে ঠাই হলো না।মামলা করে পালক পিতা মাতার বিরাগভাজন হয়েছি আগেই। স্বামীর সংসার ফিরে পাওয়ার আশায় অভিযোগ করলাম স্হানীয় সমাজপতিদের কাছে। অসহায় মেয়ে, যার শরীরে ভরা যৌবন ও চেহারা লাবণ্যে ভরপুর তার বিচার না করে কি উপায় আছে? বিচারের আশ্বাস দিয়ে সংসারে ফেরানোর যুদ্ধে নামলেন সমাজপতিরা।তারিখের পর তারিখ পড়ে।বিচার শেষ হয় না।অবশেষে সংসার জোড়া লাগানোর আকুতি জানালে শর্ত দেন সমাজপতি।তার সাথে যেতে হবে বিছানায়।তার ঘরে যেতে বলেন বিচারের জন্য।আমার প্রতি যৌনকামনা বেড়ে যায় তথাকথিত সমাজপতিদের। বিভন্ন ভাবে আমাকে যৌন হয়রানী করতে থাকলেন।জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। কোথাও বিচার পেলাম না। আমার স্বামী তালাক দিয়ে দিল।

জুলফু মিয়ার ঘরেই খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে থাকলাম।কিন্তু এভাবে কি আমার দেহ নিরাপদ রাখা উচিত?শুরু হলো নতুন অধ্যায়।পালক মামার দৃষ্টি এড়াতে পারলাম না।আমাকে নিয়ে মেতে উঠলেন যৌনউল্লাসে।তারা জানে আমার অন্য কোথাও যাওয়ার কোন সুযোগ নাই।সুযোগ নিল পুরোটাই।এতবড় পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে গেল আমার জন্য।কোথাও ঠাই না পেয়ে নিরবে নিভৃতে উদযাপন(!) করলাম বিকৃত যৌনাচার।

সবকিছু থেকে নিজেকে উদ্ধার করে বাচার চেষ্টা করলাম।গার্মেন্টস এ চাকুরী করতে চাইলাম।যেতে দিল না।তাদের উদ্দেশ্য দু’টি।আমার দেহ ভোগ ও আমার করা মামলা প্রত্যাহার।সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখল আমাকে।সবাই ঘরের বাইরে গেলে দরজা বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে যেত।অবশেষে নিজেকে মুক্ত করার উপযুক্ত সুযোগ আসল।একদিন ঘরে কেউ নাই।আছি আমি ও এক বোতল অর্গানোফসফেটের তলর।পান করে ফেললাম বোতলের সবটুকু তরল।হাসপাতালে নিয়ে গেল আমাকে।যারা আমার জীবনটাকে নিয়ে বিকৃত উল্লাসে মেতেছিলেন তাদের আমাকে বাচানোর সে কি নিরন্তর চেষ্টা(?)।তিনদিন পর আমি জীবনযুদ্ধে জয়ী (!)হয়ে চলে এলাম আমার ঘরে।জুলফু মিয়ার বসতঘরের পশ্চিমে তালতলায় সমতল থেকে তিন হাত মাটির নীচে।সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে।

আমি মাটির নীচে এসেও শান্তি পাচ্ছি না।আমার দেহ উত্তোলন করা হলো বিশ দিন পর।শুনেছি আমার জন্মদাত্রী মা বিবি ফাতেমার দ্বিতীয় স্বামী তাজুল ইসলাম আমাকে হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেছে।অথচ এ তাজুলের সাথে আমার কোনদিন দেখাই হয়নি।মার সাথেও দুই বছর ধরে তার সম্পর্ক নাই।তার দরদ এখন উতলে পড়ছে। কোন স্বার্থে?আমাকে নিয়ে আর কি না খেললেই হয় না?আর পারছিনা।একটু দয়া কর।আমাকে একটু শান্তি দাও।

সূত্রঃচট্টগ্রাম জেলার ভূজপুর থানার মামলা নং ০৩ তারিখঃ০৮/১১/২০১৬ইং।ধারাঃ৩০২/২০১/৩৪ দন্ডবিধি।
তদন্তকারী কর্মকর্তাঃপুলিশ পরিদর্শক মুহম্মদ হেলাল উদ্দিন ফারুকী।
কৃতজ্ঞতায়ঃ অরিয়ানা ফাল্লাছি,প্রখ্যাত সাংবাদিক।
ছবিঃ০১/জীবিত শিরিন আক্তার
০২/শিরিন আক্তারের কবর
০৩/শিরিন আক্তারের মরদেহ

http://culive24.com/wp-content/uploads/2018/12/shirin-.jpghttp://culive24.com/wp-content/uploads/2018/12/shirin--150x150.jpgculiveক্রাইম এন্ড "ল"গল্পশিরিন,হেলাল উদ্দিন ফারুকীআমি শিরিন আক্তার।যখন এ চিঠিটি লিখতে বসছি তখন বয়সটা মনে করতে পারছি না।তবে ঠিকানাটা মনে আছে।ভূজপুর থানা এলাকার বাগানবাজার ইউনিয়নের দক্ষিন রসুলপুর সাকিনের জুলফু মিয়ার বসতবাড়ীর অনুমান সত্তর গজ পশ্চিমে-দক্ষিণে পাহাড়ী ঢালু সংলগ্ন তালতলায় আমার বসত।ছোট্ট কুঠির।ভালো নেই আমি।অসহ্য যন্ত্রণাপূর্ণ সময় পার করছি।তবে নীতিহীন এ সমাজের অনেক অবলা নারীর...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University