“আমি কিংবদন্তির কথা বলছি”

১৯৯৩ সালে কোন এক শীতের সকালে আমি ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে যাই।অফিসের দরজার সামনেই একটি হাতল ওয়ালা চেয়ারে বসা একজন দীর্ঘদেহী মানুষ,সামনে একটি টেবিল।টেবিলের উপরে কিছু ফাইল,রেজিস্টার,কাগজ,কলম, একটি চশমা সাজানো আছে।মানুষটির গায়ে জড়ানো হালকা ক্রীম কালারের একটি চাদর,পরনে সাদা লুঙ্গী।কাছাকাছি উপস্হিত হলেই মানুষটি ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,

-ভর্তি হতে এসেছ?

আমার যেটুকু ভয় ছিল তার অনেকটাই কেটে গেল।

মৃদু-স্বরে জ্বি বলতেই।তিনি বললেন,

-ছাড়পত্র দাও।

প্রাথমিকের ছাড়পত্রটি তাঁর হাতে দিলাম।ছাড়পত্রটি হাতে নিতে নিতে পরিবারের পরিচয় জানতে চাইলেন।পরিচয় দিলাম।তিনি বললেন,
-তোর বড় ভাইকে পড়াইছি, এখন তোকেও পড়াতে হবে।
বড়ই আদর মাখা,স্নেহভরা অভিভাকত্বের সুরে কথা গুলো বললেন।
রেজিস্টারে লেখালেখি শেষ করে বললেন,

-২০০ টাকা দে।

আমার কাছে ১৮০ টাকা আছে বলেই টাকাটা তাঁর হাতে দিলাম।তিনি ১৫০ টাকা রেখে ৩০ টাকা ফেরত দিয়ে বললেন,

-যেদিন ক্লাস শুরু হবে সেদিনই বিনা বেতনে অধ্যায়ের একটা দরখাস্ত দিবি আর নিয়মিত ক্লাস করবি।

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে সালাম দিয়ে বিদায় নিলাম।

যথাসময়ে ক্লাস শুরু হলো।২/৩ দিন পর তিনি আমাকে অফিসে ডেকে পাঠালেন।ভয়ে ভয়ে তাঁর সামনে উপস্হিত হতেই বললেন,

– দরখাস্ত দিস্ নাই?আচ্ছা এখনই একটা দরখাস্ত লিখে আমার কাছে দে।

একটি দরখাস্ত লিখে তাঁর হাতে দিলাম।এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত আর কোন দিন দরখাস্ত দেয়া লাগেনি।বছরের শুরুতেই তিনি বেতন রেজিস্টারের নির্দিষ্ট কলামে লিখে দিতেন ‘বিনা বেতনে’।
এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় শুধু মাত্র বোর্ড ফি নিয়ে আমাকে ফরম পূরণের অনুমতি দিছিলেন।

আমার নামের আগে ‘মোহাম্মদ’ লিখতাম।নবম শ্রেনীতে বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন করার সময় তিনি লিখে দিলেন ‘মুহম্মদ’।বললেন,
-এটাই শুদ্ধ,কোনদিন ভুল করবি না।

৮ ম শ্রেণী পর্যন্ত তাঁর মেধা সম্পর্কে তেমন অবগত ছিলাম না।অবগত হওয়ার সুযোগ ছিল না।৯ম শ্রণীতে পড়ার সময় মাঝেমধ্যে ক্লাসে আসতেন এবং বাংলা পড়াতেন।১০ম শ্রেণীতে পুরোটা সময় তিনিই বাংলা সাহিত্যটা পড়াতেন।সাদা পাঞ্জাবী,সাদা লুঙ্গী দীর্ঘদেহী মানুষটি ক্লাসে আসতেন চক,ডাস্টার বা কোন প্রকার খাতা পত্র ছাড়াই।কোন প্রকার শাসন ছাড়াই ক্লাস থাকত পীনপতন নীরব।মন্ত্র মুগ্ধের মত সবাই শুনত তাঁর কথা।পুরো বাংলা সাহিত্যই তিনি ক্লাসে হাজির করতেন।অবিশ্বাস্য সম্মুহনী শক্তি আর মুখস্ত রাখার প্রখর মেধা কেবল তাঁর কাছেই ছিল।ক্লাস সিলেবাসের গন্ডি পেরিয়ে চলে যেত ইতিহাস,সমাজ,স্মৃতিকথা,রাজনীতি,খেলা,ধর্ম সমসাময়িক কত কিছুতেই।অনর্গল বলে যেতেন রামায়ণ, মহাভারত,ভগবতের বঙ্গানুবাদ,বিভিষণের প্রতি মেঘনাদ,পদ্মাবতী, মঙ্গল কাব্য,বৈঞ্চব পদাবলী,পীর সাহিত্য,মেঘনাথবদ কাব্য,নাথ সাহিত্য, বাউল পদাবলী,আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য,বীরবল আরও কত কি।ভরাট কণ্ঠে আবৃতি করতেন, উমর ফারুক,কপোতাক্ষ নদ,দুই বিঘা জমি,নক্সী কাথার মাঠ,বিদ্রোহী,কবর সহ বাংলা সাহিত্যের অমর সব সৃষ্টি।আমাদের অনুরোধে কতবার ক্লাসটাকে রবীন্দ্র আর নজরুল গীতির আসর বানিয়ে ছাড়লেন তার ইয়াত্তা নাই।বাংলা সাহিত্য নিয়ে ব্যাপক পড়ার সুযোগ না হলেও প্রচুর বই পড়েছি,বাংলা সাহিত্যের অনেক মেধাবীর দেখা পেয়েছি।কিন্তু,তিনি ব্যতিক্রম। তাঁর জানার পরিধি অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা।তিনি বাংলা সাহিত্যের পূজারী। পড়ানোর ক্ষমতা ছিল আকাশচুম্বি। কবিতা আর গান বড়ই ভালবাসতেন।ভালবাসতেন মনের গহীন থেকে।কবিতার প্রেক্ষাপট জানতেন।কবিতা ও সাহিত্যের মনোজগত,কবিতা ও সাহিত্য রচনার সময়ের প্রেক্ষিত,ভাবগত অর্থ,আবেদন,প্রয়োগ তিনি যেভাবে বুঝতেন তা আর কারো কাছে দেখি না।তাঁর জ্ঞানগর্ব আলোচনা থেকে বঞ্চিত হবে এ সমাজ।তার সৃষ্টিশীল মানসিকতার অভাব আমাদের পিছিয়ে দিবে নিশ্চিত।তাঁর মৃত্যু আমাকে যে ভয় লাগিয়ে দিয়েছে তা দূর করা সম্ভব নয়।এ ভার সইবার ক্ষমতা আমার নেই।তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে কিছুতেই মাথায় অন্য কিছু আনতে পারছি না।লিখতে গেলেই মাথা কাজ করে না।

এসএসসি পাসের পর মহেশখালী কলেজে পড়াকালীন তিনি দাপ্তরিক কাজে উপজেলা সদরে গেলে প্রায় সময় আমাকে দেখে আসতেন,খবর নিতেন।সর্বদা উপদেশ দিতেন।গত কয়েক বছর আগে আমি লামা থানায় কর্মরত থাকাকালীন স্কুলের পক্ষে শিক্ষা সফরে তিনি লামা গিয়ে আমাকে ডেকে নিলেন।আমি গিয়ে সালাম করতেই তিনি গর্ব করে সবাইকে বললেন,

– দেখ আমার ছাত্র কত বড় অফিসার হয়েও এখনও পায়ে ধরে সালাম করে।অল্পতেই সন্তোষ্ট থাকতেন।

কয়েক দশক আগে থেকে সামাজিক কাজে জড়িত থাকলেও স্কুলের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর আরো বেশি জড়িয়ে পড়েছিলেন এসব কাজে।হয়ত নেশা ছিল এটি।সময়টা ভালই যাচ্ছিল।গত তিন বছর ধরে আমাকে প্রায় প্রতি সপ্তাহে একবার ফোন করতেন।তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি চলে আসছিলেন এটা বুঝেই গেছিলেন।প্রকৃত ঈমানদারের মত নিজের জীবনের কিছু সীমাবদ্ধতার প্রাচীরকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য নিজেই মনে প্রাণে চেষ্টা করেছেন,আমার জানা মতে এসকল ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন।তাঁর মধ্যে তাকওয়া কাজ করেছিল প্রচুর।এ সময়ে এমন মানসিকতা দেখে আমি আশান্বিত হয়েছিলাম।এ সমাজে যখন বড়ই প্রয়োজন ছিল তাঁর মত মানুষের তখনই তিনি চলে গেলেন না ফেরার জগতে।

একান্তই পারিবারিক প্রয়োজনে গত মে মাসে তিনি আমার কক্সবাজারের বাসায় এসেছিলেন।অনেক কথার পর অনেকটা জোর করেই দুপুরে একবেলা খাওয়ানোর সুযোগ হয়েছিল।তখন কথার ছলে বলেছিলেন,জনাব গোলাম কুদ্দুছ চৌধুরীর পরামর্শে ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন কৃতি শিক্ষার্থীদের জন্য একটা সংবর্ধনা সভার আয়োজন করতে যাচ্ছেন তিনি।আমি তাঁকে কথা দিছিলাম এ কাজে সর্বোচ্চ সহযোগীতা করার।তিনি আদেশ করেছিলেন,
-যত বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুক আয়োজনে হাজির থাকিস্।

সর্বশেষ গত জুন মাসে আমাদের গ্রামে একটি জানাজায় তাঁর সাথে দেখা ও কথা হয়।জানতাম তিনি মৃত্যুর জন্য তৈরী ছিলেন।কিন্তু,এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তা ভাবতে পারিনি।

তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।তাঁর মত স্নেহভরা আদেশ দেওয়ার কেউ কি আছে?তাঁর শেষ ইচ্ছাটা(সংবর্ধনা সভা) পূরণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার বিনীত অনুরোধ। সাথে তাঁর দীর্ঘ দিনের স্মৃতি বিজড়িত ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি পাঠাগার স্হাপনের দাবি করছি।ইউনুছখালী বাজার থেকে স্কুল পর্যন্ত রাস্তাটি তাঁর নামে নামকরণ করা যায়। জানিনা তিনি লিখতেন কিনা।যদি তাঁর কোন প্রকার লেখার পান্ডুলিপি থাকে তবে তা উদ্ধার করে প্রকাশনার ব্যবস্হা নেয়া যেতে পারে। এ কাজে আমরা তাঁর শিষ্যরা সবার আগেই সহযোগীতা করব।

দাপ্তরিক ভাবে তিনি ইউনুছ খালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘অফিস সহকারী’ হিসেবে চাকরি করলেও তাঁর সে পদবি,সে পরিচয় তিনি সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন,তাঁর পান্ডিত্ব,তাঁর মেধা,অভিভাবকীয় আচরন,তাঁর ব্যক্তিত্ব,তাঁর দূরদর্শিতা,নেতৃত্বগুণ ইত্যাদি দিয়ে।তিনি তাঁর ব্যক্তিগুণে প্রদর্শিত পরিচয়কে কালের গর্বে নিক্ষেপ করে সাধারণের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ‘মাস্টার আবু ছৈয়দ’,আর লক্ষ লক্ষ শিষ্যের কাছে হয়ে উঠেছিলেন প্রিয় ‘আবু ছৈয়দ স্যার’।তিনিই তো কিংবদন্তি।আমি তাঁর কথাই বলছি।

শান্তিতে থাকুন প্রিয় স্যার।বাংলা সাহিত্যের হে পন্ডিত।যুগে যুগে আপনার জন্ম হবে না জানি, তাই আপনার সাহিত্যজ্ঞান বেচে থাকুক আমাদের প্রয়োজনে,সমাজের শুদ্ধতার প্রয়োজনে।

লেখকঃ মুহম্মদ হেলাল উদ্দিন
পুলিশ ইন্সপেক্টর, বাংলাদেশ পুলিশ।

http://culive24.com/wp-content/uploads/2018/08/abu-sayed-sir.jpghttp://culive24.com/wp-content/uploads/2018/08/abu-sayed-sir-150x150.jpgculiveব্যাক্তিত্বআবু সৈয়দ,ইউনুছ খালী,কিংবদন্তি,বাংলা সাহিত্যের বিশারদ,মহেশখালী,শিক্ষক'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' ১৯৯৩ সালে কোন এক শীতের সকালে আমি ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে যাই।অফিসের দরজার সামনেই একটি হাতল ওয়ালা চেয়ারে বসা একজন দীর্ঘদেহী মানুষ,সামনে একটি টেবিল।টেবিলের উপরে কিছু ফাইল,রেজিস্টার,কাগজ,কলম, একটি চশমা সাজানো আছে।মানুষটির গায়ে জড়ানো হালকা ক্রীম কালারের একটি চাদর,পরনে সাদা লুঙ্গী।কাছাকাছি...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University