‘অর্ধেক পথ দাঁড়িয়ে যাই অর্ধেক পথে বসে
আমরা চবিয়ান ভাইভাই, সম্প্রীতি বাড়াই’

দুইটা গল্প বলবো। গল্পে যাওয়ার আগে কিছু কথা বলি!

দেশের একমাত্র ট্রেন পরিবহন সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় চবি। এই শাটল চবির গর্ব। প্রতিটি ছাত্রের প্রাণের সাথে মিশে আছে এই শাটল। শাটল যেমন প্রতিটি ছাত্রের প্রাণ; তেমনি এই শাটলেও যেন প্রাণ ফিরে আসে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে। যদি আমাকে বলা হয়, পৃথিবীর সুন্দরতম একটি অপেক্ষা কি? আমি বলবো, প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে শাটল ট্রেনের অপেক্ষা! আর চমৎকার সুরেলা আওয়াজ? অবশ্যই শাটলের হুইসেল। এই শাটলেই আমাদের হাসি – কান্না, গল্পগুজব আর গানে সুর বাঁধা। টেবিলে বসলেই যে ছেলেটা, পারুক বা না পারুক, টেবিলের সাথে হাত পিটিয়ে ড্রাম বাজানোর চেষ্টা করে সেই ছেলেটার চবির। আর ড্রাম বাজানোর হাতেখড়ি শাটলেই। এই শাটলেই, ঘামের গন্ধ সইতে না পারা মেয়েটিও হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বসে গল্প করে। দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা কোন ছেলে হয়তো গরমে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হাসিমাখা মেয়েটির প্রেমে পড়ে যায়! আর এভাবেই ভালোবাসার গল্পটি শুরু হয় এই শাটল থেকেই। এই শাটলেই গানের তালে তালে মাথা নাড়িয়ে কেউ কেউ পরীক্ষার প্রিপারেশন নেয়, কেউ গল্পের বই পড়ে, কেউ বিসিএসের পড়ালেখা করে, কেউ মুভি, কেউ অর্থনীতি-রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করে। পৃথিবীতে একমাত্র শিক্ষকবিহীন চলন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবীদার এই শাটল! ইউরোপ-আমেরিকার ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা যদি ক্লাসরুমে তৈরি হয়, তবে আমাদেরগুলো তৈরি হয় এই শাটল থেকে!

এ পর্যন্ত সব ঠিকই আছে! এরপর আর ঠিক নেই!
সমস্যা বহুবিধ। সমস্যার কথা নাই’বা তুললাম। মায়ের যতোই সমস্যা থাকুক। সন্তান যেমন মাকে ছাড়তে পারেনা। মা’ও তেমনি সন্তানকে আগলে রাখে। শাটল আমাদের মায়ের মতোই। শুধু কতৃপক্ষের একটু সুনজর, আন্তরিকতাই এই ভগ্নদশার মা ও তার সন্তানদের বহুবিধ সমস্যার নাভিশ্বাস থেকে বাচাতে পারে। প্রশাসনের বেশীরভাগই চবির সাবেক ছাত্র। এই শাটলেই তাঁদের বেড়ে উঠা। তবুও তারা কিভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখে আমার জানা নেই! এসি বাসে চড়ে যখন জানালা দিয়ে শাটলের দিকে নজড় দেয়, হাজার ছেলে মেয়ে গাদাগাদি করে, দরজায় বসে, জানালা ব্লক করে, ট্রেনের ছাদে করে যে যাওয়া-আসা করে; এতে তাদের চক্ষুলজ্জা হয় কিনা আমার জানা নেই! আমারও কিছু বলার নেই! যে গাছ তার শিকড় কেটে ফেলে, তার ডালপালাও তাকে বাঁচাতে পারেনা। সেদিকে নাই’বা গেলাম। আকাল মান্দ্রা ইশারা কাফি।

শাটলের বগি বাড়ানো, সংস্কার সকল শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবী। সাধারন শিক্ষার্থীদের পাশে নিয়ে এমন একটি আন্দোলন করার জন্যে চবি ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ। দাবী যদি বাস্তবায়ন না হয়, হারটা যেমন সাধারন শিক্ষার্থীদের জন্যে লজ্জার তেমনি চবি ছাত্রলীগের জন্যে। এজন্যে ছাত্রলীগকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে। সেটা আপনাদের উপর। কারণ, আন্দোলনের যাত্রা আপনাদের দিয়ে, শেষটাও আপনাদের করতে হবে। সাধারন শিক্ষার্থীরা সবসময় পাশে থাকবে। এখন প্রশ্ন হলো, দাবী বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা কি করতে পারি?

এবার প্রথম গল্পে আসি

‘অর্ধেক পথ দাঁড়িয়ে যাই অর্ধেক পথে বসে
আমরা চবিয়ান ভাইভাই, সম্প্রীতি বাড়াই’

জ্বি, এবার এ গল্পে আসি। আমাদের দুর্গম যাত্রাকে সুগম করতে এই উক্তির বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এজন্যে আমাদের উদার মানসিকতার বিকল্প নেই। শুধু মাত্র এই একটি উক্তির বাস্তবায়নই সিট ধরার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে দিবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য – চবির কিছু ভাইয়ের প্রচেষ্টায় এরকম একটা ট্রেন্ড চালু হলেও আমাদের চর্চার অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই ট্রেন্ডটা ফিরিয়ে আনতে হবে। ৪০ মিনিটে দাঁড়িয়ে গেলে কেউ মরে যায়না ঠিকই তবে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকায় পা ঠিকই ব্যাথা হয়। সবাই একটু স্বস্তি চাই।

☑ যারা বটতলী/ষোলশহর থেকে উঠেন তারা ক্যান্টনমেন্ট গিয়ে অন্যকে সিট ছেড়ে দেন। যারা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বসবেন তারা চৌধুরীহাট / ফতেহাবাদ গিয়ে অন্যদের সিট ছেড়ে দেন।

☑ শহরে আসার সময়, চৌধুরীহাট সিট ছেড়ে দেন। যারা চৌধুরীহাট বসবেন তারা ক্যান্টনমেন্টে সিট ছেড়ে দেন।

শুধু একটু সিট রোটেশনই চরম একটা সমস্যার সুন্দর সমাধান দিতে পারে! আসুন নিজে দায়িত্বে মানার চেষ্টা করি। অন্যকেও উৎসাহিত করি।

দ্বিতীয় গল্পটি হলো –

একবার ভাবুন একটি বগি। কোন চিল্লাফাল্লা নাই! একদিকে দুই বন্ধু কথা বলছে। অন্যদিকে পাশাপাশি ছয়টি সিটের সবাই চুপ। কেউ কারো সাথে আড্ডা দিচ্ছেনা। হাসছে না। কারণ কেউ কাউকে চেনেনা। আর চিনলেও, সিনিয়র – জুনিয়রিটির কারণে হাই হ্যালো করে শেষ! দাঁড়িয়ে / বসে থাকা বন্ধুগুলোও চুপসে গেছে, কারণ সিনিয়র ভাইয়ের জন্যে প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারছেনা। সিনিয়রদেরও সেইম অবস্থা! কারণ কি? কারণ সীট ধরার নিয়ম নেই! আর তাই বন্ধুরাও সকাল সকাল এসে সিট ধরেনা। ফোন দিয়ে বলেনা, ওমুক বগিতে আছি। সবাইকে নিয়ে আয়! কারণ, যে আসবে সে বসবে! ৪০ টা মিনিট এমন নিরলস জার্নি! সহ্য হবে?

চবির সম্প্রতিগুলো তৈরি হয় এই শাটল থেকে। বন্ধুত্বের বন্ধনগুলো দৃঢ় হয় এই শাটলে একসাথে বসে যাওয়া আসায়। বন্ধু-বান্ধবগুলো যখন একসাথে উঠি দাঁড়িয়ে গেলেও মজা লাগে। আর বসে যেতে পারলেতো কথাই নেই! সিট ধরার প্রবণতা বেশি থাকে ১ম আর ২য় বর্ষের স্টুডেন্টদের মধ্যে। এরাই ভার্সিটি শাটল মুখরিত করে রাখে। ৩য় / ৪র্থ / মাস্টার্স এর কেউ সিট নিয়ে মাথা ঘামায় না। কোন রকমে দাঁড়াতে পারলেও খুশি। আমি নিজে যখন ১ম বর্ষে ১৫/২০টাও সিট ধরতাম। ৩য় বর্ষের পর শেষ কবে সিট ধরেছি মনেও নেই! চবিতে জুনিয়ররা যথেষ্ঠ সম্মান দিয়ে চলে সিনিয়রদের। জুনিয়র এসে যখন না বলে বসে যাবে, মানতে পারবেন? সিট ধরলে, আপনারা ব্যবস্থা নিবেন! কাদের বিরুদ্ধে নিবেন? আপনারই জুনিয়র তারা। যখন উঠাই দিবেন, ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সিট কেড়ে নিবেন, সাথে সাথে আপনার প্রতি সম্মানটাও নিজেই কেড়ে নিবেন। চবি শাটল যেমন একটা ঐতিহ্য। তেমনি সিট ধরাটাও একটা ট্রেডিশন। বগি রাজনীতি নিষিদ্ধের পর এমনিতেই শাটলের গানগুলো – রঙবেরঙের বগিগুলো আমরা খুব মিস করি। নতুনরা হয়তো একদিন জানবেই না। এমন কিছু ছিলো! সিট ধরার ট্রেডিশনটা কেড়ে নিয়ে কবরের নির্জনতা নিয়ে আসবেন না। প্লিজ!

আমরা যারা সাধারণ শিক্ষার্থী আছি। আসুন –

↪ চলন্ত ট্রেনে লাফ দিয়ে না উঠি
↪ দরজা ও ইঞ্জিনে না বসি
↪ একজন ৬টার বেশি সিট না ধরি এবং অর্ধেক পথ শেষে নিজ দায়িত্বে অন্যকে সিট শেয়ার করি। অন্যকেও উৎসাহিত করি।

আর আশা করি, কতৃপক্ষ বগি বৃদ্ধি ও সংস্কার, মাল বগি – ছোট আকারের বগি, হসপিটাল বগি অপসারণ, রাতের শাটলে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে মানসম্মত ও নিরাপদ শাটল উপহার দিবে।

ট্রেন দূর্ঘটনার জন্যে আরেকটি বিষয় দায়ী, তা হলো, একই সাথে দুটি ট্রেনের ক্রসিং। এক্ষেত্রে দেখা যায়, যে ট্রেন আসে, সেটা দেখি অথচ পেছনে যে আরেকটি ট্রেন হুইসেল দিয়ে আসছে সেটা খেয়াল থাকেনা। মস্তিষ্ক ভ্রম হয়। তাই এ ব্যাপারে টাইম শিডিউল চেঞ্জ করে, নিরাপদ ক্রসিং নিশ্চিত করা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখবে আশা করি। ধন্যবাদ।

Md Lokman Hossain
BBA / HRM / CU

https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2016/11/shuttle-train-of-cu.jpg?fit=720%2C476https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2016/11/shuttle-train-of-cu.jpg?resize=150%2C150culiveউদ্দীপনা'অর্ধেক পথ দাঁড়িয়ে যাই অর্ধেক পথে বসে আমরা চবিয়ান ভাইভাই, সম্প্রীতি বাড়াই' দুইটা গল্প বলবো। গল্পে যাওয়ার আগে কিছু কথা বলি! দেশের একমাত্র ট্রেন পরিবহন সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় চবি। এই শাটল চবির গর্ব। প্রতিটি ছাত্রের প্রাণের সাথে মিশে আছে এই শাটল। শাটল যেমন প্রতিটি ছাত্রের প্রাণ; তেমনি এই শাটলেও যেন প্রাণ ফিরে আসে...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University