চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী-শিক্ষক মাইদুল ইসলাম। আরও অনেক শিক্ষকের মতো উনি কোটা-সংস্কার হোক এটা চান। শিক্ষার্থীদের যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে তার প্রতিকার চান। এই হচ্ছে তার “অপরাধ”। এই অপরাধে ফেসবুকে বিপুল গালাগালি চালালেন আমাদেরই কিছু ছাত্র। জামাইত্তা, জামাতের দালাল, সুশীল, লুইচ্চা- ইত্যাদির পাশাপাশি অকথ্য সব গালাগালি। এখানেই শেষ হয়নি ব্যাপারটা। ওই ছাত্ররা মাইদুলের বিভাগের সভাপতির সাথে দেখা করে মাইদুলের নামে নালিশ জানালেন। এরপর “কুলাঙ্গার ও সুশীল গিরগিটি”দের সাবধান করে সমাবেশ করলেন, বক্তৃতা দিলেন। সমাজবিদ্যা বিভাগের সভাপতির সাথে সাক্ষাতের ছবি, সমাবেশের ছবি -এসব ফেসবুকে দিয়ে আমার মতো অসংখ্যা মানুষকে তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপের কথা আবারও জানিয়ে দিলেন।

যারা এইসব করেছেন তারা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এদের অনেকের সাথে আমার খুব ভাল জানাশোনা। কেউ কেউ আমার ফেসবুক বন্ধু। দারুন স্মার্ট। কারও কারও সাথে দেখা হলে অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে সালাম-আদাব দেন। তারাই এসব করেছেন, করছেন। আমি কি বিস্মিত হয়েছি?

শিক্ষক মাইদুলকে এভাবে অপমান করার, তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করার, শারীরিকভাবে আঘাত করার, প্যান্ট খুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার কোনো খবর কিন্তু কোনো মিডিয়ায় নাই। এতে কি আমি বিস্মিত হয়েছি?

এই সব প্রকাশ্য অভব্যতার ব্যাপারে আমাদের শিক্ষক সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া কী? শিক্ষক সমিতি বা মাইদুলের বিভাগের সহকর্মীদের কোনো প্রতিক্রিয়া আমার নজরে পড়েনি। আমি কি বিস্মিত?

মাইদুল স্যারের শিক্ষার্থী আছেন শত শত। তাদের কি কিছু প্রতিক্রিয়া আছে? না, তাও নাই। আমি কি বিস্মিত হব?

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইত্যাদি কতো সংগঠন- তাদের আছে কোনো প্রতিবাদ? না, নাই। আমি কি বিস্মিত হচ্ছি?

না, আমি কিছুতেই বিস্মিত হইনি। হই না আজকাল। একটা স্বাধীন দেশকে বড় হতে দেখতে দেখতে একটু একটু করে বিস্মিত হওয়ার সব ক্ষমতা ক্ষয়ে গেছে।

কে, কেনো, কী করে বা করে না- সে বিষয়ে এখন আমার কাছে অনেকগুলো উত্তর আছে।

কিছু ছাত্র কেনো এমন করছেন? তারা খুব উচ্ছৃঙখল? না, এক্কেবারে না। “উপরের নির্দেশ” বা “পরামর্শ” ছাড়া তারা কিছুই করেন না বলেই আমার জানা। আবাসিক হলে হলে ঢুকে এই ছেলেগুলোর ওপরেই তো পুলিশ কারণে-অকারণে যাচ্ছেতাই লাঠিপেটা চালায় বারংবার। তারা তার প্রতিবাদ করতে পারতেন কিন্তু করেন না। কারণ? ওপরের অনুমতি নাই। তারা অসহায়। যে নির্দেশ বা নির্দেশনা পায়, তারা তা নির্বাহ করে বিনাপ্রতিবাদে, তবে সব সময় দ্বিধাহীনভাবে নয়।

শিক্ষকরা কেনো কিছু বলেন না? এর বেশ কিছু সম্ভাব্য উত্তর আছে। একটা বলি। বাংলাদেশের সমাজের বিরাট বদল হয়েছে, হচ্ছে। অত্যন্ত দুর্বল আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবারগুলো থেকে উঠে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে যাচ্ছি আমরা বেশিভাগ। অনেক সংকট-পীড়িত জীবন দেখে আসা আমরা নতুন কোনো পীড়ন নিতে অক্ষম। শিক্ষকদের অবস্থাটা আমাদের দেশের নারীদের মতোই। একটা “ভাল বিয়ে” হয়েছে, থাকা-খাওয়ার একটা বন্দোবস্ত হয়েছে, সামাজিক পরিচয় হয়েছে, এখন স্বামীর সব নির্যাতনকে নিয়তি মনে করে মুখবুজে সংসারে টিকে থাকাটাই তার জীবনের সাধনা। সুখ-শান্তি-মর্যাদা-ভালবাসা-আদর-স্নেহ-স্বাধীনতা- এইসব তো সংসারে না হলেও চলে, তাই না? আমি জানি, আমার মতোই অনেক শিক্ষক নির্যাতিত নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে না পেরে আত্ম-অবমাননায় ভুগছেন, পুড়ছেন আত্মদহনে। তারা জানেন, এই মেরুদণ্ডহীনতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা অসম্ভব। কিন্তু সেই স্ত্রীটির মতোই, “সংসারের সুখ” ত্যাগের ঝুঁকি নিতে তারা অক্ষম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা চিরকাল এমনই থাকবেন।

মিডিয়ায় কেনো কোনো সংবাদ নাই? একটা বড় কারণ, প্রশাসন চায় না- এসব “বাজে খবর” মিডিয়ায় আসুক। ক্যাম্পাসের সাংবাদিকদের অধিকাংশই সর্বার্থে খুব দুর্বল। সহজ-সরল সাংবাদিকতা করতে তারা অক্ষম। প্রশাসনের বা ক্ষমতাবানদের অনুগ্রহ বা অবহেলা অস্বীকার করার মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা তাদের নাই। তাদের শিক্ষকদেরই নাই, তো তাদের থাকবে কোত্থেকে? আমারই বিভাগের সাংবাদিকদের যদি জিজ্ঞেস করি, “নিউজ নাই কেনো?” তারা বলবে, “ভিক্টিম তো কোনো অভিযোগ করেনি, জিজ্ঞেস করেছিলাম, কথা বলতে রাজি হয়নি” ইত্যাদি। এভাবেই সাধারণত তারা তাদের দায়িত্ব এড়ায়। এমন ভাব যে, ক্যাম্পাসে একটা লাশ পড়ে থাকতে দেখলেও তারা সংবাদ করতে পারে না, কারণ লাশ অভিযোগ করেনি! অথচ, ভিক্টিমের মৌনতাই সবচে বড় খবর, কারণ তার মৌনতাই তার অসহায়ত্বের সবচে বড় নিদর্শন।

সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ করে না কেনো? এর উত্তরটা আমার অজানা। আমি গত ত্রিশ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় পরিমণ্ডলে আছি। ছাত্রছাত্রীদের অসীম সহ্য শক্তি দেখে এসেছি। সব মুখ বুজে সহ্য করার অপার ক্ষমতা আছে এদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের। আবার সামান্য উসিলায়, অতিসামান্য কিছুকে অবলম্বন কোরে সব লণ্ডভণ্ড কোরে দেওয়ার মতো তাদের বিপুল ক্ষমতারও সাক্ষ্য দিতে পারি আমি। সুতরাং এই ছাত্রছাত্রীদের কিছু করা-না-করা নিয়ে কোনো মন্তব্য করা কঠিন। আজ কিছু করছে না বলে কালও করবে না- এ কথা বলার যোগ্যতা নাই আমার।

অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষিত-বাঙালী খুবই ধান্ধাবাজ সুবিধাবাদী একটা গোষ্ঠী। আমি অনেক বদ ছাত্রনেতা-পাতি নেতাকে জীবনে বড় সাফল্য পেতে দেখেছি। অনেক ভদ্র ভাল ছাত্রকে নষ্ট-নেতা-আমলা-ব্যবসায়ী হতে দেখেছি। আমাদের শিক্ষিত-বাঙালীর সমাজটাই যেন বিকৃত-রুচীর। এদেশের সব শিক্ষিত মা-বাবা সন্তানকে আদর্শ সৎ মানুষ হতে বলেন কিন্তু কোনো মা-বাবা অসৎ দুর্নীতিবাজ পুত্রের কাছ থেকে টাকা নিতে অস্বীকার করছেন- এ প্রবণতা দেখিনি। এমন একটা দেশে বিস্মিত হওয়ার সুযোগ কোথায়?

এমন বিস্ময়হীন বন্ধ্যা সময়ে মাইদুল, তানজিম, ফাহমিদ, রাজ্জাক খান, আ-আল মামুন বা নিউটন স্যারদের মতো শিক্ষকরা বরং বিস্ময় তৈরি করেন। এ দেশে কোনো শিক্ষককে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হলে এক্কেবারে নিজ দায়িত্বেই করতে হয়। কেউ তার পাশে থাকে না। বরং রাজনীতি-প্রশাসনে, আরও বিপদে ঠেলে দেওয়ার লোক থাকে প্রচুর। এ কারণেই কখনো কখনো মাইদুল-ফাহমিদ-তানজিম-নিউটন স্যাররা নিজেরাই আমাদের আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন। অসময়ে তারাই তুলে নেন মুক্তির যুদ্ধের অবিনশ্বর চেতনার মশাল। এরা যে এদেশে আছেন, এটাই বরং আমাকে বিস্মিত করে আজকাল।

লেখকঃ সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী আর রাজী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

(লেখকের ফেসবুক পেজে থেকে )

https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2018/07/image-60429-1531764755.jpg?fit=800%2C526https://i1.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2018/07/image-60429-1531764755.jpg?resize=150%2C150culiveইন্টারভিউচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহকর্মী-শিক্ষক মাইদুল ইসলাম। আরও অনেক শিক্ষকের মতো উনি কোটা-সংস্কার হোক এটা চান। শিক্ষার্থীদের যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে তার প্রতিকার চান। এই হচ্ছে তার 'অপরাধ'। এই অপরাধে ফেসবুকে বিপুল গালাগালি চালালেন আমাদেরই কিছু ছাত্র। জামাইত্তা, জামাতের দালাল, সুশীল, লুইচ্চা- ইত্যাদির পাশাপাশি অকথ্য সব গালাগালি। এখানেই শেষ হয়নি...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University