বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেও বাইরে খাওয়া-দাওয়া করায় আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। ভর্তির পর ধীরে ধীরে সব রকম খাবারে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলা যায়।
প্রথম দিকে ক্যাম্পাসে প্রায় সময় উপোষ থাকতাম। তেমন কিছু খেতাম না। ক্লাস সেরে একেবারে বাসায় এসে খেতাম। তো একদিন বন্ধুদের অনুরোধে প্রথম যায় নিজের অনুষদের ক্যান্টিনে খাওয়ার জন্য। সাথে বন্ধুরাও ছিলো। আমি আর আমার এক বন্ধু গিয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। বাকিরা খাবার আনতে গেলো। এর মাঝে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখছিলাম সব কিছু। কেউ ছোলা দিয়ে খিচুড়ি খাচ্ছিলো, কেউ ডিম দিয়ে, কেউ সবজী দিয়ে, কেউ কেউ আলুর চপ দিয়ে, আবার কেউ মুরগীর ছোঁয়া দিয়ে বানানো পেঁয়াজ আর ডালের চাপ দিয়ে। কিন্তু মুরগী দিয়ে খিচুড়ি খেতে তেমন কাউকে দেখলাম না। যদিও আমরা মুরগী খিচুড়ি নিয়েছিলাম। আমাদের খাবার সামনে আসার পর আমি রীতিমত যে ধাক্কাটা খেয়েছিলাম তা এখনো ভুলিনি। এক প্লেইট হলুদ রঙের ভাত। তাতে ৩-৪ দানা ডাল। গোটা ২-১ টা কাঁচা মরিচ আর আলু-মিষ্টি কুমড়া-টমেটো ২-৩ টুকরো। এই হলো খিচুড়ি। আর মুরগী??? একটা পিং-পং বলের সমান টুকরো। যা দেখে দেখে ভাত খাবো নাকি সেটা দিয়ে ভাত খাবো বুঝতে পারছিলাম না। তখনের দামটা মনে নাই। তবে শেষ যখন খেয়েছিলাম তখন ২৭/২৮ টাকা ছিলো। মুখে দেওয়ার পর অবস্থা আরো খারাপ। গিলে ফেলবো নাকি বমি করে দিবো সেই চিন্তায় মুখে ভাত নিয়েই বসে ছিলাম অনেক্ষণ। পরে একদিন বিরক্ত হয়ে একজন কর্মরত ছেলেকে বললাম, (যে প্লেইটে মুরগীর টুকরো দিচ্ছিলো) “ভাই, একটা মুরগীরে যদি ২২-২৩ টুকরা করে কাটেন সেখানে তো দেখে দেখে খাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা।“ তার প্রতি উত্তর ছিলো,” আপা, আমাদের তো পোষায় না। আমরাও বুঝি আপনারা খাইতে পারেন না। কিন্তু অনেক বড় ভাই আছে খাইয়া টাকা না দিয়েই চলে যায়। চাইতেও পারি না। তাই বাধ্য হইয়া মুরগীরে এত টুকরা করি। আপা, কষ্ট করি খাইয়া লন…। “
ম্যাম, এই খাবারের দাম ২৭ টাকা!
এই ক্যান্টিনেই আরেকদিন খেলাম গরুর মাংস দিয়ে সাদা ভাত আর ডাল। একটা বাটিতে ছোট্ট এক টুকরা মাংস, এক টুকরো হাড়, আরেক টুকরো চর্বি। দাম ৩৫ টাকা। ঐ স্পেশাল এক টুকরো মাংসটা দিয়ে ডাল দিয়ে কোনরকমে খেয়ে নিজের পেটকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে এলাম।
ম্যাম, এই খাবারের দাম ৩৫ টাকা!
এরপর আরেক বন্ধুর অনুরোধে একদিন খেলাম হলের ডাইনিং-এ। টোটাল খাবার মূল্য ২০ টাকা! বাহ্! খেতে বসলাম। আনলিমিটেড সাদা ভাত আর ডালের সাথে বেগুন-ঝোল আর এক বাটি পানির মত টলটলে ঝোলে এক টুকরো মুরগী আর এক টুকরো আলু। চিলি চিকেনের টুকরো যেমনটা হয় ঠিক সেরকম। কোন রকমে মুরগীর টুকরোটাকে দেখে দেখে আলুর টুকরো আর বেগুনের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে এসে গেলাম। নিজেকে মনে হচ্ছিলো, আমি ডায়বেটিস আর জন্ডিসের রোগী।
ম্যাম, খাবারের দাম ২০ টাকা করে ২ বেলায় ৪০ টাকা! ৩৮ টাকা থেকে ২ টাকা বেশি। তাও শুধুমাত্র দুপুর আর রাতের খাবারের হিসাব এটা।
সকালের নাস্তা আর বিকালের হালকা কিছু খাবারের হিসেব করলে দাঁড়ায় প্রায় ৫৫-৬০ টাকা। ম্যাম, আপনার সেই ৩৮ টাকা থেকে আরো ১৭-২২ টাকা বেশি! খাবারের মানের কথা না হয় সবাই বাদই দিলাম। কারণ, হলের ক্যান্টিনে খেতে গিয়ে ২ বার যে ভুল করেছিলাম আমি তা তো কখনো সহজে ভুলার না। ডালের বোলে হাত ধুয়ে ফেলেছিলাম ময়লা পানি মনে করে…। সবজীতে আলু-মিষ্টি কুমড়া ছাড়া কিছুই দেখিনাই। মুরগীর বর্ণনাতো উপরে দিলামই। মাছ বলতে টাকি, রুই আর তেলাপিয়া ছাড়া কোন মাছ সেরকম নাই। আর উদ্ধারকর্তা হিসেবে আছে ভর্তা।
ম্যাম, আপনি কি প্রতিদিন ২ বেলা করে এই খাবার গুলো ৫-৬ বছর নিয়মিত খেতে পারবেন???
এবার আসি ১৫ টাকার বেহেশতে…
শহরে থেকে পড়াশোনা করার সুবাদে হলে থাকার প্রয়োজন খুব একটা পড়েনি। কিন্তু কোন কাজ-কর্ম থাকলে যেতাম। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় কিংবা ক্লাস লেকচার, নোট সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়ে হলে থাকা না হলেও দিনের সময়টা ওখানে থাকতাম। মাশা আল্লাহ্…! সিটের যে প্রস্থ…! কেউ একা থাকে। কেউ ডাবলিং করে থাকে। একা থাকলেও তা মানা যায়। কিন্তু ডাবলিং????!!!
আমার আর থাকার সাহস, ইচ্ছা কোনটায় আর গত ৫ বছরে হয়নাই। বান্ধবীদের অনেক অনুরোধ ছিলো তাদের সাথে এক রাত থাকার জন্য। কিন্তু লোহার চার কোণা ফ্রেমে বন্দী কাঠের শক্ত পাটাতনের উপর মাঝারী মানের তোশক বিছানো ১৫ টাকার ঐ চিকন বেহেশতে থাকার খায়েশ আমার কখনোই হয়নাই। আর বাথরুমের দরজা কোনোটা ঝুলানো তো, কোনটা ছিদ্র। ভাগ্য ভালো কোন গোপন ক্যামেরা নাই। না হলে প্রতিনিয়ত কত শত ছাত্রীর স্ক্যান্ডাল তৈরি হতো আল্লাহ্ জানেন।
ম্যাম, আপনি কি পারবেন ঐ বিলাসিতার ঘর ছেড়ে এসে ৫ বছর ১৫ টাকার এমন বেহেশতে থাকতে???…

কৌতুহল বেশি থাকার কারণে ঘুরে ঘুরে এগুলো দেখতে যেতাম। আর বাসায় এসে নামাজে শুকরিয়া আদায় করতাম। যাতায়াতের কষ্ট হলেও ১৫ টাকা আর ৩৮ টাকার এমন বেহেশত থেকে আমি আমার বেহেশতে অনেক ভালো আছি…।।
শুধু ভালো নেই ওরা। যারা জঙ্গী। যারা আন্দোলনকারী। যারা আপনার দেওয়া ১৫ টাকার সিট ভাড়া আর ৩৮ টাকার খাবারের উপর বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। যা আমাদের, ওদের কাছে অধিকার। আর আপনার কাছে শুধুমাত্র অনুদান, ভিক্ষা, দয়া… অথচ করের টাকাটাও কিন্তু আমরাই দিয়ে থাকি ম্যাম, যে টাকাটা দিয়ে আপনি অনুদান দেন। আর সংসদে দাঁড়িয়ে হিসেব কষে খোঁটা দেন।

#রহমান_স্বর্ণা,চবি

http://culive24.com/wp-content/uploads/2018/07/RonukHasan-1462483418-95afb19_xlarge.jpghttp://culive24.com/wp-content/uploads/2018/07/RonukHasan-1462483418-95afb19_xlarge-150x150.jpgculiveক্যারিয়ারবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেও বাইরে খাওয়া-দাওয়া করায় আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। ভর্তির পর ধীরে ধীরে সব রকম খাবারে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলা যায়। প্রথম দিকে ক্যাম্পাসে প্রায় সময় উপোষ থাকতাম। তেমন কিছু খেতাম না। ক্লাস সেরে একেবারে বাসায় এসে খেতাম। তো একদিন বন্ধুদের অনুরোধে প্রথম যায় নিজের অনুষদের ক্যান্টিনে খাওয়ার...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University