অভি মহাজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

লুঙ্গি পড়ে রাস্তায় হাঁটতে বের হয়েছি। আমি অবশ্য কখনও লুঙ্গি পড়ে রাস্তায় বের হই না। কারণ এখন পর্যন্ত আমি লুঙ্গির সঠিক গিঁট রপ্ত করতে পারি নি। লুঙ্গি পরে ঘুমাতে গেলে পরদিন সকালে খাটের নিচ থেকে লুঙ্গি খুঁজে নিতে হয় আমাকে। ভাগ্যিস আলাদা রুমে থাকি আমি।

বাসায়ও শুধু মা, বাবা আর ভাই দেখেছে আমার লুঙ্গি পড়ার স্টাইল। বাইরে কেউ কখনও আমাকে লুঙ্গি পড়া অবস্থায় দেখেনি। আমি কারেন্ট নাই দেখেই বের হয়েছি। গরমও লাগছিল প্রচুর। বাসার সামনের গলিতে বুক ফুলিয়ে নবাবি ভঙ্গিতে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পায়ের টান খেয়ে লুঙ্গি কোমড় হতে খুলে মাটিতে পড়ে গেল।

তাড়াতাড়ি আশেপাশে তাকালাম। না কেউ নেই। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তাহলে আমাকেও হয়তো কেউ দেখেনি এটা ভেবে তাড়াতাড়ি লুঙ্গি টেনে তুললাম। এরপর বাসার দিকে পা বাড়ালাম। বাসায় উঠার জন্য সিঁড়িতে পা দিয়েছি। এমন সময় দেখি উপরতলার সুন্দরী মিম আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মেয়েটার সাথে কোনোদিন কথা বলিনি। হঠাৎ মনে ভয় ঢুকে গেল। আমার লুঙ্গি খুলে যাওয়াটা সে দেখে ফেললো নাতো?

প্রথমবারের মতো তার সাথে কথা বললাম।
জিজ্ঞেস করলাম,” কি হলো? হাসছো কেন?”
সে মুচকি হেসে জবাব দিল,” ভাইয়া একটা জিনিস দেখেছি আজ। আপনি এমন কেনো?”
আমি তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করলাম,” কি দেখেছো?” এমন সময় মা ডাক দিলেন উপর থেকে,” কিরে ওখানে কি করছিস তুই?”

দৌড় দিয়ে উপরে উঠে গেলাম। আর জিজ্ঞেস করা হলো না। পরদিন মিমকে কলেজে যাওয়ার সময় গেইটে দেখলাম। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “গতকাল কি দেখেছো তুমি?” এবারও মুচকি হাসলো মিম। কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় মিমের মা এসে মিমের পাশে দাঁড়ালেন। এমনভাবে তাকালেন যেন আমি উনার মেয়েকে ইভটিজিং করছি। আমি আর কথা বাড়ালাম না। এদিকওদিক থাকিয়ে চলে এলাম সেখান থেকে।

নাহ্, এভাবে আর পারা যাচ্ছে না। রাগ চেপে বসলো। ইজ্জতের প্রশ্ন আমার। আমাকে জানতেই হবে। কলেজ ছুটির সময় মিমের কলেজের গেইটে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কিন্তু সাথে মিমের বান্ধবীরা ছিল। ওরা ভেবে বসলো আমি মিমের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। পরদিন বিষয়টা মিমের সারা কলেজ হয়ে গেল। এদিকে আমার কয়েকজন বন্ধুর কানেও গেল বিষয়টা। ওরাও কথাচ্ছলে ঠাট্টা করতে লাগলো আমার সাথে। মিমের পিছনে যে ছেলেগুলো ঘুরতো ওরা আমাকে “মেরে ফেলবে”, “কেটে ফেলবে”, “ভেজে ফেলবে”, “পুড়ে ফেলবে” এসব বলে বলে হুমকি দিতে লাগলো। এরকম করতে করতে সারা এলাকা হয়ে গেল যে আমি মিমের পিছনে পিছনে ঘুরছি।

রাগে দু-তিন দিন ঘর থেকে বের হইনি। যেদিন বের হলাম সেদিন সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখি মিম সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। ভাবলাম কেউ যখন নেই গিয়ে একবার শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করি। সেই পুরোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম,” কি দেখেছিলে সেদিন?”
মিম ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার পিছনে তাকিয়ে দৌড় দিল। পিছনে তাকিয়ে দেখি মা দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝলাম আর রক্ষা নেই আজ।
রাগী কণ্ঠে মা বললেন,” বাসায় চল। কথা আছে।”

গেলাম। রুমে ঢুকামাত্র মা জিজ্ঞেস করলেন, ” তাহলে আমি এতদিন বাইরে বাইরে যা শুনেছি তা সত্যি?”
আমি হিন্দি সিরিয়ালের মতো লম্বা সময় নিয়ে উত্তর দিলাম,” না মা। সব মিথ্যা।”
মা ধমকে উঠলেন। রাগান্বিত হয়ে বললেন, ” আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো। তোর জন্য আমি আমার মান সম্মান ডুবাতে পারবো না। ”

কিছু বললাম না। রাগ করে আমার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। গভীর রাতে কাউকে না জানিয়ে গিয়ে ভাত খেয়ে নিলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মা খুব উৎফুল্ল। ছোটভাই শপিং এর জন্য বায়না করছে মায়ের কাছে। আমি ধমক দিলাম তাকে, “এটা শপিং এর টাইম নাকি? বিয়ে নামছে নাকি কারও? এমনিতে মনমেজাজ ঠিক নাই ।”

ও মৃদু হেসে বলল,” বিয়ের শপিং এর কথাই তো বলছি।” আমি চমকে উঠলাম,”কার বিয়ে?”
মা পিছন থেকে আমাকে ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করে বললেন, “তোর বিয়ে। মিমের সাথে তোর বিয়ে ঠিক করেছি আমি।”
আঁতকে উঠলাম আমি। না মা এ হতে পারে না। কিন্তু কীভাবে বুঝাবো মাকে? কোনোমতেই বুঝতে চান না তিনি। দুই-তিনদিন ধরে অনেক আন্দোলন চালালাম। কিন্তু কাজ হলো না।

অবশেষে সবাই মিলে বিয়ের মঞ্চে তুলে দিল আমাকে। “ভয় পাস না পাগলা। আসলেই যদি মিম কিছু দেখেও থাকে তাহলে অসুবিধে নেই। মিম এখন তোর জীবনসঙ্গী হবে। ইজ্জত তো বাঁচলো।” — এটা বলে বলে স্টেজে বসে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম আমি।

হঠাৎ মিমের দিকে চোখ গেল। দেখি ওর আশেপাশে কেউ নেই। কেউ না দেখে মতো মিমের পাশে গেলাম। গিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম,” কি দেখেছিলে তুমি সেদিন?” এমন সময় দুই একজনের চোখ গেল আমার দিকে। সবাই বৌ পাগলা বলতে লাগল আমাকে।
মা চিল্লানি দিয়ে উঠলেন,” ওরে গোলাম, বিয়ের পর সারাদিন বৌ এর পাশে বসে থাকিস। অন্তত এই ভরা মজলিশে আমার মানসম্মান খাইস না।” নিজের মান সম্মান না খেতে বলে আমার মান সম্মান খেয়ে দিলেন তিনি। পৃথিবীর ইতিহাসে হয়ত আমিই প্রথম বর যাকে বিয়ের স্টেজে “গোলাম” ডাকা হয়েছে।

অপমানে আর মিমের দিকে তাকাইনি। বিয়ের সকল কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করলাম। মিমকে নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকলাম।
ঢুকা মাত্র বজ্রকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, “সেদিন হেসেছিলে কেন? কি দেখেছিলে?”

মিম হাল্কা লজ্জিত হয়ে ঘোমটা সরিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিল,” আপনার লুঙ্গিতে একটা স্টিকার লাগানো ছিল। সেটাই দেখেছিলাম সেদিন। এতো আত্মভোলা মানুষ আপনি? সেটা খেয়াল করেননি?”
আমি দৌড়ে গিয়ে সেই লুঙ্গিটা টেনে নিলাম। দেখি হ্যাঁ নতুন লুঙ্গিতে স্টিকার লাগানো রয়েছে। আর এই স্টিকারই আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শপথ নিয়ে নিয়েছি আর জীবনেও লুঙ্গি পরে রাস্তায় বের হবো না। আপনারাও সতর্ক থাকবেন। অকালে জীবন হারাবেন না। মনে রাখবেন বিয়ে করার জন্য সবসময় প্রেম, ভালোবাসা, আত্মীয়-স্বজনের আবদার লাগে না। মাঝেমধ্যে ছোট্ট একটা স্টিকারই যথেষ্ট। স্টিকার খুলে রাস্তায় হাঁটুন। অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে প্রতিরোধ করুন।

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2018/05/অনুগল্প.jpg?fit=500%2C250https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2018/05/অনুগল্প.jpg?resize=150%2C150culiveগল্পঅনুগল্পঅভি মহাজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। লুঙ্গি পড়ে রাস্তায় হাঁটতে বের হয়েছি। আমি অবশ্য কখনও লুঙ্গি পড়ে রাস্তায় বের হই না। কারণ এখন পর্যন্ত আমি লুঙ্গির সঠিক গিঁট রপ্ত করতে পারি নি। লুঙ্গি পরে ঘুমাতে গেলে পরদিন সকালে খাটের নিচ থেকে লুঙ্গি খুঁজে নিতে হয় আমাকে। ভাগ্যিস আলাদা রুমে থাকি আমি। বাসায়ও শুধু...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University