অভিজ্ঞতার পুঁজি নিয়ে হাঁটি-হাঁটি পা করে চলে এসেছেন অনেকদূর। ছাত্রবস্থা থেকেই করে আসছেন নিজস্ব পত্রিকা সম্পাদনা ও নিজের হাতে বিলির কাজ। সেটিও রূপান্তরিত হয়েছে হাতিয়ার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকায়। শিশু কিশোরদের জন্য গড়লেন জাতীয় শিশু কিশোর পত্রিকা কিশোর শিখা। তরুনদের বই প্রকাশ পরবর্তী হতাশা দেখে ব্যথিত মন তাকে কিছু করার তাড়না দেয়, সেই তাড়না থেকেই শুরু করেন শব্দ প্রকাশের প্রতিষ্ঠান। শব্দে শিল্পচর্চা করার আহবানে প্রতিবছর তার প্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছে অগনিত নবীনের বিনামূল্যে বই। সহজ শর্ত ও লেখকবান্ধব প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বছর পাঁচেকের মাথায় তিনি হয়ে উঠলেন পছন্দের শীর্ষ প্রকাশক। স্বপ্ন দাঁড়িকমা প্রকাশনীকে তিনি দাঁড় করাবেন দেশের অন্যতম ইন্ডাস্ট্রীতে। আজ ১৫ই অক্টোবর, ২৮ তম জন্মদিন তার। সিইউলাইভ টুয়েন্টিফোর ডট কমের পক্ষ থেকে হৃদয় ইসমাইল কথা বলছেন সময়ের অন্যতম নিভৃতচারী উদ্যোক্তা প্রকাশক আবদুল হাকিম নাহিদ এর সাথে।

লেখক ও প্রকাশক আবদুল হাকিম নাহিদ

 

হৃদয় ইসমাইল: জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষা সনদে আপনার জন্মতারিখ ২১শে ফেব্রুয়ারি। এর পেছনের রহস্যটুকু কি?

আবদুল হাকিম নাহিদ: আমার সার্টিফিকেটে জন্মতারিখ ২১ ফেব্রুয়ারি। এসএসসি পরীক্ষার আগে রেজিস্ট্রেশন করার সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের মন মতো একটা জন্মতারিখ বসিয়ে নেন। সেই সময় জন্ম নিবন্ধন কার্ড ছিল না বলে এই ভুলটা হয়েছে। পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখটা আমার জন্মতারিখ হিসেবে ব্যবহার করছি। কিন্তু আমার প্রকৃত জন্মতারিখ পনের অক্টোবর। এ দিনটা আমাকে যে পরিমাণ আনন্দ দেয়, আমি পুলকিত বোধ করি, ছোট বড় সকলের ভালোবাসায় সিক্ত হই; সার্টিফিকেটের জন্মতারিখে সে আনন্দটা পাই না।

হৃদয় ইসমাইল: আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করা স্বত্তেও প্রকাশনা জগতে আসাটা কি কাকতালীয় নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

নাহিদ: মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। স্নাতকে আমাকে যেসব বিষয়ে পড়তে দেওয়া হলো সেসব বিষয়ে আমার পড়ার আগ্রহ ছিল না। আমার পরিবার ও প্রতিবেশী স্বজনরা চেয়েছেন, আমি আইন পেশায় আসি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আইন পড়েছি। আইন বিজ্ঞানে পড়া চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা।আর আইন পেশা সুন্দর সব পেশার মধ্যে অন্যতম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দুবছর মনেপ্রাণে চেয়েছি, এ মহৎ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে। কিন্তু আমার প্রথম বই ‘আলোর মিছিল’ প্রকাশের পর আমি শিল্প সাহিত্যের প্রতি বেশি অনুরাগী হয়ে পড়ি। ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে সংবাদভিত্তিক পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক দ্বীপশিখা’ সম্পাদনার কঠিন কাজটি স্থানীয় কিছু প্রিয় মানুষের সহযোগিতায় খুব সহজে সম্পন্ন করি। পত্রিকা সম্পাদনা করার সময় আমার কেন যেন মনে হয়েছে, ব্যক্তি আমি আইন জেনে বিচার করা বা বিচারের প্রার্থনা করার চেয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতনা করাটাই উত্তম। আর সংবাদপত্রের মাধ্যমে এ কাজটা আরো অনেক সহজ।
তারপর আমি দেখি-

লেখালেখিতে নবীন ও তরুণ লেখক বই প্রকাশে নানা জটিলতায় পড়েন। আমি এ শিল্পের কাজটাকে আরো সহজ ও সৃষ্টিশীল করতে পারি। তাই পত্রিকা প্রকাশের তিনবছর অভিজ্ঞতা আমার প্রধান মূলধন মনে করে আমার মূলত প্রকাশনা শিল্পে আসা।

চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদে বক্তব্য রাখছেন আবদুল হাকিম নাহিদ

হৃদয় ইসমাইল: খুবই অল্প সময়ে শতাধিক লেখকের বিশ্বস্ত প্রকাশনীতে পরিণত হয়েছে ‘দাঁড়িকমা প্রকাশনী’। এই বিশ্বাস অর্জনের জায়গাটুকু থেকে বলুন- লেখকদের আস্থা পাওয়ার কারণগুলো মূলত কি কি?
নাহিদ: আমাদের লেখক সম্প্রদায় মনে করে, প্রকাশনা জটিল একটি প্রক্রিয়া এবং প্রকাশকেরা দুর্বোধ্য এক প্রাণীর নাম। লেখকেরা অনেক রহস্যভেদ করতে পারলেও, এ দুটোর কোনটার মজ্জায় প্রবেশের সুযোগ থাকে না।

আমি লেখকের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি কিনা জানি না তবে, জটিল ও দুর্বোধ্য শিল্পের কাজটা সহজ ও প্রাঞ্জল করেছি। লেখকদের সাথে কথা কাজে মিল রেখে নিজের দায়িত্বটা সুন্দরভাবে পালন করার চেষ্টা করছি। সহজ শর্তে বই প্রকাশ ও বই বিক্রির রয়্যালিটি তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি। একজন লেখকের প্রত্যাশাকে নিজের শতভাগ দিয়ে শ্রদ্ধা সাথে করছি। বিভিন্ন লেখকের দুঃসময়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে পাশে থেকেছি। এরই ফলে অনলাইনে ও অফলাইনে শুধু লেখক নয়, অনেক পাঠক আমাদের শুভাকাঙ্খী হিসেবে পেয়েছি শুধুমাত্র আন্তরিকতা ও ভালোবাসার কল্যাণে।

হৃদয় ইসমাইল: সবসময় আড়ালে থেকেছে ব্যক্তি আবদুল হাকিম নাহিদ, সামনে এসেছে তার প্রকাশনীর নাম আর লেখকবৃন্দের নাম। নিজেকে আড়াল রাখার প্রবণতা সবসময়,কেনো?
নাহিদ: ব্যক্তি আমি আজ আছি, কাল হয়তো থাকবো না। কিন্তু দাঁড়িকমা প্রকাশনী যুগযুগ ধরে লেখক ও পাঠকের সেতুবন্ধনে কাজ করে যাবে। তাই ব্যক্তি আবদুল হাকিম নাহিদের যাপিত জীবন ও দাঁড়িকমা প্রকাশনীর কার্যক্রম দুটো আলাদা রেখে প্রতিষ্ঠানের কাজ প্রতিষ্ঠান যেন ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন করতে পারে সে বিষয়ে আমি খুব সচেতন।

হৃদয় ইসমাইল: সম্প্রতি চলছে দেশব্যাপী “দাঁড়িকমা-এক গল্পে তারকা”। কেমন সাড়া পেয়েছেন?
নাহিদ: ‘দাঁড়িকমা এক গল্পে তারকা’ প্রতিযোগিতায় আমরা সাড়ে সাতশো লেখকের অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি, তাতে খুব সহজে সবাই বুঝতে পেরেছেন দাঁড়িকমার প্রতি লেখকের আস্থা ও ভালোবাসা অন্য উচ্চতায়। আমি মনে করি, দাঁড়িকমা তাঁদের ভালোবাসার সঠিক মূল্যায়ন করবে এবং সত্যিকার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে পারবে।

প্রকৃতির মত নির্মল উদার হতে চান আব্দুল হাকিম নাহিদ

হৃদয় ইসমাইল: নবীনদের পাণ্ডুলিপি সবসময় উপেক্ষিত হয় বলে নবীনদের দাবী। দাঁড়িকমা তাদের জন্য বিশেষ কিছু কি করছে?
নাহিদ: নবীন লিখিয়েদের জন্য প্রতিবছর আমাদের খরচের ২৫% বাজেট থাকে, যা দিয়ে আমরা তাদের বই সম্পূর্ণ প্রকাশনার খরচে প্রকাশ করে থাকি। বইমেলা-২০১৭ সালে ৪৮ জন লেখকের বই দাঁড়িকমা নিজ খরচে প্রকাশ করেছে, যা লেখকের প্রথম বই।

হৃদয় ইসমাইল: বই প্রকাশের আগে নবীনদেরকে কোন দুটি জিনিস খেয়াল রাখা উচিত?
নাহিদ: আগেও বলেছি, বই প্রকাশে একজন লেখক তাড়াহুড়ো করলে ভবিষ্যতে তাকে হয়তো এ বইয়ের জন্য অনেক কষ্ট করতে হতে পারে। একটি বই একটি লিখিত দলিল। তাই বই প্রকাশের আগে পাণ্ডুলিপিটি অগ্রজ কোন লেখককে সময় নিয়ে পড়ার অনুরোধ করতে পারে এবং পাণ্ডুলিপি তৈরীর বছর দুয়েক পরে প্রকাশকের অফিস জমা দিতে পারে। অগ্রজ লেখক তার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দেবেন আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ফলে লেখক নিজে তার পাণ্ডুলিপির প্রতিটা তথ্য নির্ভুলভাবে প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন।

হৃদয় ইসমাইল: আসন্ন “একুশে বইমেলা-২০১৮” নিয়ে দাঁড়িকমা প্রকাশনীর ভিশন কি?
নাহিদ:

বইমেলা ২০১৮ সালে নবীন ও প্রবীণ লেখকের শতাধিক বই প্রকাশিত হবে। দাঁড়িকমা বইমেলার শেষ দিন স্টলে লেখকদের ডেকে রয়্যালিটি প্রদানের যুগান্তকারী কাজটি করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।

কারণ আমাদের লেখক ও প্রকাশকের সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম রয়্যালিটি নিয়ে নানাবিধ জটিলতা। এ ছাড়া ঢাকা বইমেলা ছাড়াও দেশের সবকয়টা জেলা ও বিভাগীয় শহরে গতবারের ন্যায় দাঁড়িকমা পাঠকের সুবিধার জন্য স্টল বরাদ্দ করবে।

হৃদয় ইসমাইল: “আলোর মিছিল” ও “পাললিক হাতিয়া” নামের দুইটি মৌলিক গ্রন্থের পাশাপাশি আপনার সম্পাদনায় বেরিয়েছে বেশ কিছু বই। লেখক আবদুল হাকিম নাহিদ নাকি প্রকাশক আবদুল হাকিম নাহিদ কোন নামে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ খুঁজে পান?
নাহিদ: লেখক আবদুল হাকিম নাহিদ পরিবারের একজন সদস্য আর প্রকাশক হিসেবে পরিবারের অভিভাবক। অন্যভাবে বললে লেখালেখি বা সম্পাদনা আমার প্রেম আর প্রকাশনা পরিবার। দুটোর ভারসাম্য রেখে নিজেকে এগিয়ে নিতে চাই।

হৃদয় ইসমাইল: খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের অনেকেই প্রকাশনীটির ভূয়সী প্রশংসা করছেন,অনেকেই আবার সংযুক্ত হচ্ছেন সৃজনশীল কাজগুলো দেখে। বিশেষ কার কার বই বের হচ্ছে এইবার?
নাহিদ: একজন তরুণ উদ্যােক্ত হিসেবে বড়রা পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছেন, আমি তাঁদের প্রতিটা দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করছি। তাঁদের প্রংশসার চেয়ে আমার দরকার পরামর্শ ও ভুলগুলো সুন্দর ভাষায় দেখানো। নির্মলেন্দু গুণ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সেলিনা হোসেনসহ প্রথিতযশা অনেক লেখকের বই এ বছর দাঁড়িকমা থেকে প্রকাশিত হবে।

হৃদয় ইসমাইল: নানান ধর্মী বই প্রকাশ করার পাশাপাশি সম্পাদনা করে থাকেন। বেশ কয়েকবছর ধিরে এইধরনের সৃজনশীল প্রকাশনীগুলো একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা বলে পরিচিত ছিলো। তা সত্ত্বেও এতো কম বয়সে সফলতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন। সবমিলিয়ে কি বলবেন?
নাহিদ:

বর্তমানে  সবার মাঝে একটা অস্থিরতা প্রায় দেখি, পাঠক বই পড়ে না কিংবা বইয়ের পাঠক কমে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, পুরোপুরি ঠিক নয়। পাঠক ভালো বই পড়ছে এবং এখনও ভালো বইয়ের বেশ পাঠক আছে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ আবির্ভাবে প্রকাশনা শিল্পের প্রতি মানুষের নির্ভরতা হার কমছে, এটা বিশ্বাস করি। আবার এও বলতে হয়, প্রযুক্তি প্রকাশনা শিল্পের কাজের মান বৃদ্ধি করেছে, বাঁচিয়েছে অনেক সময় ও সীমাবদ্ধতা। সবকিছুর পরেও আমি সফলতা ও ব্যর্থতা কোনটাই এই অল্প সময়ে গ্রহণ করছি না কারণ সামনে আরো প্রচুর সময় পড়ে আছে। এখন একটাই কাজ, দায়িত্বটা ঠিকঠাকভাবে পালন করে প্রকাশনা শিল্পে নতুনত্ব আনা ও পাঠক সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখা।

হৃদয় ইসমাইল: আসন্ন বইমেলায় আপনার কি কোন বই আসছে? বইয়ের নাম কি হতে পারে?
নাহিদ: সত্যিকার অর্থে বলতে কি, লেখালেখিতে যে পরিমাণ সময়ের প্রয়োজন প্রকাশক হয়ে তা আমার এখন নেই। তবে আসছে বইমেলায় বা কোন এক সময় ‘সুন্দরের চোখে জল’ নামে গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হতে পারে।

হৃদয় ইসমাইল:২৮ তম জন্মদিনে আপনাকে কাঠগোলাপের শুভেচ্ছা।

নাহিদ: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে এবং পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে। ভালো থাকবেন।

https://i1.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/10/FB_IMG_1508056519684.jpg?fit=720%2C720https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/10/FB_IMG_1508056519684.jpg?resize=150%2C150হৃদয় ইসমাইলউদ্দীপনাএক্সক্লুসিভক্যারিয়ারতরুণ স্টাইলফিচারব্যাক্তিত্বব্লগসাহিত্যঅভিজ্ঞতার পুঁজি নিয়ে হাঁটি-হাঁটি পা করে চলে এসেছেন অনেকদূর। ছাত্রবস্থা থেকেই করে আসছেন নিজস্ব পত্রিকা সম্পাদনা ও নিজের হাতে বিলির কাজ। সেটিও রূপান্তরিত হয়েছে হাতিয়ার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকায়। শিশু কিশোরদের জন্য গড়লেন জাতীয় শিশু কিশোর পত্রিকা কিশোর শিখা। তরুনদের বই প্রকাশ পরবর্তী হতাশা দেখে ব্যথিত মন তাকে কিছু করার...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University