আজ ১০ সেপ্টেম্বর “বিশ্ব আত্নহত্যা বিরোধী দিবস“। এই দিবসকে সামনে রেখে গতকাল থেকেই সিইউলাইভ২৪.কম প্রকাশ করছে আত্নহত্যা বিরোধী বিশেষ রচনা। তারই ধারাবাহিকতায় হৃদয় ইসমাইল  আজ তুলে ধরছেন সংস্কৃতিমনষ্ক প্রিয়জন, লেখক ও সাংবাদিক হৃদয় হাসান এর বিশেষ অনুপ্রেরণামূলক লেখা। তিনি একাধারে আবাহনী সমর্থক গোষ্ঠী এর প্রেসিডেন্ট এবং স্বাধীন সাংস্কৃতিক সংগঠন এর চেয়ারম্যান। লেখালেখি করেন চট্টগ্রামের বেশ কিছু পত্রিকায় এবং স্থানীয় সাংগঠনিক প্রিয় মুখগুলোর একজন তিনি।

 

ছেলেটি যেভাবে শেষমুহুর্তে বাঁচতে চেয়েছিলো
হৃদয় হাসান

আত্নহত্যা মহাপাপ।বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যে আত্নহত্যা একটি। সকল ধর্মেই আত্নহত্যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মেতো আত্নহত্যাকে খুব কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে তা মহাপাপ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবেও আত্নহত্যাকে একটি অপকর্ম বলে গণ্য করা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ কখনো আত্নহত্যা করতে চায় না। কেউ যখন কোন ব্যাপারে গভীরভাবে হতাশায় ভোগে, আলোর দিশা হারিয়ে চোখে চারিদিকে অন্ধকার দেখে, সমাধানের আর কোন পথ খুঁজে না পেয়ে তখনই সে আত্নহত্যা করা সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা,সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব থেকেই বৈষম্যের সৃষ্টি এবং পারিবারিকভাবে অসচেতনতাও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতায় আত্নহত্যাগুলো সংগঠিত হয়। সব মিলিয়ে দেখা যায় একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ অথবা নারী, একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা, একজন যুবক বা যুবতী, কিশোর বা কিশোরী যখন নিজের বা পারিবারিক জীবনের উপর ঘটে যাওয়া কোন গুরুতুপূর্ণ ঘটনা মেনে নিতে পারেনা তখনি সে চারিদিকে অন্ধকার দেখে। এই অবস্থায় কেউ যদি তাদের পাশে বন্ধুর মতো মমত্বের পরশ বুলিয়ে নির্ভরতার হাত বাড়িয়ে নাদেয়, তখনি তারা সবকিছু ছাপিয়ে জীবন বিসর্জনের দিকে যায়। আমাদের দেশে বিশেষ কিছু কারণে আত্নহত্যা করার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।

প্রেমে ব্যর্থতা,ধর্ষণ,পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, ইভটিজিং এর শিকার হওয়া, পারিবারিক কলহ,স্বামী-স্ত্রীর বিভেদ,জীবনের উপর হতাশাবোধ,ধার-দেনা, পারিবারিক বা সামাজিক লাজ-লজ্জার ভয় ইত্যাদি কারণে চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে একসময় আত্নহত্যা করে বসে।চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়।তখন বিচার-বুদ্ধি লোপ পায় ও সাধারণ জ্ঞান আর কাজ করেনা।তখনি লোকচক্ষুর অন্তরালে আত্নহত্যার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে যায়। এখানে সদ্য ঘটে যাওয়া বাস্তব একটি ঘটনা উল্লেখ না করে থাকতে পারলামনা।

গত ৭ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ এক কাছের বন্ধু সহ মনে প্রফুল্লতা আনয়নের জন্য কর্ণফুলী নদীতে নৌকা ভ্রমণে যাই। বেলা বারোটায় নদীতে জোয়ার শুরু হয়েছে কিছুক্ষণ হয়। আমাদের হস্তচালিত সাম্পান অভয়মিত্র ঘাট থেকে রওনা করে নতুন ব্রিজ পার হয়ে সামান্য গেলেই হঠাৎ আমাদের সত্তরোর্ধ্ব মাঝি আমাকে বলেন চাচা…দেখেনতো ঐটা মানুষের মাথা মনে হচ্ছেনা? সঙ্গে সঙ্গে ঐদিকে দৃষ্টি দিলাম।কিছুক্ষণ অবলোকন করার পর বুঝতে পারলাম আসলেই তাই। দেরি নাকরেই মাঝিকে সাম্পান নিয়ে ছুটে যেতে বলি।আমরাও উত্তেজনায় সবকিছু ভুলে ছোট্ট সাম্পানে দাঁড়িয়ে যাই।সাম্পান যতই মাথাটার দিকে এগুতে থাকে ততই যেনো আমাদের উত্তেজনা বাড়তে থাকে।দূর থেকে দেখি মাথাটা একবার ডুবছে আবার ভেসে উঠছে।এরমধ্যেই কাছে চলে এলাম। শুধু নাক আর চোখের অংশ দেখা যাচ্ছে।বেচারা বাঁচার জন্য অনেক কসরত করছে। একবার ডুবে যায় আবার ভেসে উঠে নাক দিয়ে নিশ্বাস নিতে চেষ্টা করছে। হাত-পা নাড়াতে চেষ্টা করে কিন্তু তাও যেনো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।আমাদের সাম্পান প্রায় কাছাকাছি আসাতেই বেচারা একবারে নিস্তেজ হয়ে একবার ডুবছে একবার ভাসছে। আমরাও আল্লাহ আল্লাহ করছি যাতে বেচারাকে বাঁচানো যায়।কাছে এসে আমরা চিৎকার করি হাত বাড়িয়ে দিতে। ও হাত বাড়াতে চায় কিন্তু পারেনা,শক্তি নেই।আমরাও চিৎকার করে উৎসাহ দিতে থাকি।একসময় অনেক কষ্টে সে হাত বাড়িয়ে দেয়… তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা খপ করে ধরে ফেলি। টেনে সাম্পানে তুলতে চাই পারিনা। আমার মধ্যেও ভয় কাজ করতে থাকে। টেনে তুলতে গিয়ে যদি আমি নদীতে পড়ে যাই? আমি তার হাতটি শক্ত করে ধরে রাখি আমাদের সাম্পানের সাথে। কাপড়সহ ভিজে তার শরীর অনেক ভারি হয়ে যাওয়ায় আমি একা টেনেও তুলতে পারছিলামনা। আবার একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম আমি যদি পড়ে যাই! ততক্ষণে দূর থেকে একটি ইঞ্জিন নৌকা চলে আসে আমাদের কাছাকাছি। ঐ নৌকা থেকে হারুন নামের মধ্যবয়সী একজন লাফিয়ে পানিতে নেমে যুবকটিকে আমরা সহ আমাদের সাম্পানে তুলে আনি। আরো সহযোগিতা করেন অন্য সাম্পানের গফুর ও সাহাবুদ্দীন নামের একজন। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া যে ছেলেটি প্রাণে বেঁচে যায়। পরে তার সাথে কথা বলে জানা যায় ছেলেটির নাম আরিফ। পরিবারের সাথে অভিমান করে সে আত্নহত্যা করার উদ্দেশ্যেই নতুন ব্রিজের উপর থেকে প্রায় ১০০ ফুট নিচে নদীতে লাফ দিয়েছিল। পানি থেকে তোলার পরে দেখলাম তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। অনেকক্ষণ পরে তার হুশ ফিরে এনে তার মনের কথাগুলো জানলাম। কষ্টের কথা শুনে তাকে অনেক বুঝালাম যে-

পরিবারে একসাথে থাকলে এমন অনেককিছুই হয়। তাই বলে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কোন মানে হয়না। জীবন একটাই…তা একবার হারালে আর ফিরে পাওয়া যায়না।

তুমি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও। আরিফ তখন তার ভুল বুঝতে পারলো ও চরম কান্ড জ্ঞানহীন কাজের জন্য লজ্জিত হলো।

যেই ছেলেটি পরিবারের সাথে রাগ করে একটু আগেই আত্নহত্যার জন্য এত উপরের ব্রিজ থেকে গভীর নদীতে ঝাঁপ দেয়।

সেই ছেলেটি যখন মূহুর্তেই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার জন্য গভীর নদীর পানির সাথে একাকী লড়াই করতে থাকে তখন বেঁচে থাকার আকুতি যে কত তীব্র হতে পারে তা নিজের চোখে না দেখলে ভাবাই যায়না।

আত্নহত্যার মতো গুরুতুপূর্ণ অনৈতিক কর্মকান্ডকে নিরুৎসাহিত করতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবেও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন নারী নির্যাতন, ইভটিজিং,এসিড সন্ত্রাস, ধর্ষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ ও দ্রুত বিচার আইনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের সুরক্ষায় বিভিন্ন আইনকে বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশব্যাপী এর বিরুদ্ধে প্রচারণা বাড়াতে হবে। সমাজের ও সমাজপতিদের অনেক দায়িত্ব আছে। সামাজিকভাবে বিচারাচারে পক্ষপাতীত্বহীনভাবে কঠোর ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে কোনরুপ ছাড় দেওয়া চলবেনা এবং অসহায়দের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে জনমত গঠণ ও প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। পারিবারিকভাবেও অনেক দায়িত্ব আছে।পরিবারের একজন সন্তান বা সদস্য কোন কারণে মানসিক চাপে থাকলে তারপাশে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াতে হবে।প্রতিটি পরিবার যদি তার সদস্যদের ব্যাপারে একটু সচেতন হয়, বিপদে আপদে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্তদের পাশে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ও মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে উদ্দীপনামূলক কাজের মাধ্যমে পাশে থাকে তবে এই আত্নহননের মতো মহামারী থেকে আমাদের আমাদের দেশ মুক্তি পাবে বলে বিশ্বাস করি।

রাষ্ট্র,সমাজ ও পরিবারের একটু একটু অবহেলা, অসচেতনতা ও অসতর্কতার কারণেই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও প্রিয় মানুষগুলো মূহুর্তেই নাই হয়ে যাচ্ছে।

এ বড়ই বেদনার।এ বড়ই নির্মমতার স্বাক্ষী হয়ে আমাদের বিবেককে কুড়েকুড়ে খাচ্ছে।আমাদের সহানুভূতি, আমাদের একটু সচেতনতা,একটু দায়িত্বপূর্ণ আচরণই পারে পাশের মানুষটিকে মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে সুন্দর সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে পৃথিবীর আলো বাতাসে হাসি খুশিতে বেঁচে থাকতে।


 

এইচ আই, চবি।

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/09/textgram_1504982602.png?fit=1024%2C1024https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/09/textgram_1504982602.png?resize=150%2C150Top NewsStoryUncategorizedউদ্দীপনাএক্সক্লুসিভগল্পন্যাশনালব্লগমিডিয়াসাহিত্যআজ ১০ সেপ্টেম্বর 'বিশ্ব আত্নহত্যা বিরোধী দিবস'। এই দিবসকে সামনে রেখে গতকাল থেকেই সিইউলাইভ২৪.কম প্রকাশ করছে আত্নহত্যা বিরোধী বিশেষ রচনা। তারই ধারাবাহিকতায় হৃদয় ইসমাইল  আজ তুলে ধরছেন সংস্কৃতিমনষ্ক প্রিয়জন, লেখক ও সাংবাদিক হৃদয় হাসান এর বিশেষ অনুপ্রেরণামূলক লেখা। তিনি একাধারে আবাহনী সমর্থক গোষ্ঠী এর প্রেসিডেন্ট এবং স্বাধীন সাংস্কৃতিক সংগঠন এর...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University