ছোটগল্প – নিখিল

মদিনা জাহান রিমি

 

 

 

বিজ্ঞান ক্লাসে আজ ভাইভা পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শেষে একই ক্লাসের দুই প্রতিবেশী বন্ধু, আয়েশা এবং নিখিল হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। আয়েশা বলল-
– স্যার ভাইভাতে কি ধরল?
– চেয়ারের হাতল। আর উনার হাতে একটা কলমও ধরা ছিল!
আয়েশা হাঁটা থামিয়ে দেয়। বলে-
– ফাইজলামি করিস নাতো, তোকে কি প্রশ্ন ধরল?
– আচ্ছা! প্রশ্ন ধরার কথা তো জিজ্ঞেস করিস নি। রক্তচাপ কি জিজ্ঞেস করলেন।
-এইরে, তোকে তো সহজ প্রশ্ন ধরেছেন।
গল্প করতে করতে বাড়ির কাছে চলে এসেছে দুজন। আয়েশা হাসি হাসি মুখে বলল-
– আজ সন্ধ্যায় বিয়ে খেতে যাবো।
– বিয়ে খায় কীভাবে? বল যে তুই বিয়ের দাওয়াত খেতে যাবি।
আয়েশা শব্দ করে হেসে ওঠে। হাসি থামিয়ে বলে-
– হয়েছে! এবার বাড়ি যা।

আয়েশা বাড়ির ভেতরে চলে যায়। ও ঘরে ঢোকার কয়েক মিনিট পরেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়, মিষ্টি ধরণের বৃষ্টি। ঠাণ্ডা বাতাসে অসাধারণ পরিবেশ তৈরি হয়। বাড়ির সামনের কদম ফুলের গাছ ফুলে ফুলে হলুদ হয়ে গেছে, ফুল হাতে নিয়ে ভিজতে ইচ্ছে করছে ওর। বাবা বাসায় আছে বলে আয়েশা ভিজতে পারছে না। আয়েশার বাবা ভীষণ রক্ষণশীল। একটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে উনি কতটা রক্ষণশীল। পাশের হিন্দু বাড়িতে যখন পূজার ঢাক বাজে উনি অকথ্য ভাষায় গালি দিতে থাকেন মনে মনে। হিন্দু কেউ বাড়িতে এলে দরজা খুলে দেন না। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার সময় ওজু করে তিনি শরীরের ময়লা দূর করছেন ঠিকই, কিন্তু তার যে মনে ময়লা আছে তা তিনি কীভাবে দূর করবেন?
পরেরদিন সকালে আয়েশা স্কুলে যাবার সময় বাবা উঠোনে বসে বাজারের লিস্ট করছেন। আয়েশাকে ডেকে সামনে বসতে বললেন। উনার চোখ দেখে মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু বলবেন। বললেন-
– পাশের বাড়ির হিন্দু ছেলেটার সঙে রাস্তায় হাঁটছিলে গতকাল?
– জি।
আয়েশাকে কষে থাপ্পড় দিলেন। আয়েশা কাঁপছে ভয়ে। হুংকার দিয়ে বাবা বললেন-
– হিন্দু হল সব বদমাইশের হাড্ডি। মনে থাকবে?

আয়েশা মুখ ভার করে স্কুলে এলো। ক্লাসে বসে আছে মাথা নিচু করে। নিখিল ক্লাসে ঢুকেই তা খেয়াল করলো। ব্যাগ রেখে সে আয়েশার পাশের সীটে বসলো। বলল-
– আকাশে গনগনে সূর্য, তুই চেহারায় মেঘ নিয়ে বসে আছিস কেন?
– আব্বু তোর সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন।
– আমাকে তো বদমাইশের হাড্ডিও বলেছেন। তোদের বাড়ির উঠোনে কেউ কথা বললে সেটা আমার ঘর থেকে আমি শুনতে পাই স্পষ্ট। হাহাহা!
নিখিল হাসি থামিয়ে বলল-
– ক্লাসের সব মেয়েরা ঢঙ্গী আর বোকা, কিন্তু তুই বুদ্ধিমান। তোকে আমাদের খুব ভালো বন্ধু মনে করি। হৃদয় এবং আনিসও। তোর বাবা ওদের সঙে বন্ধুত্ব করলে রাগ করেন না কিন্তু আমার ক্ষেত্রে করেন। আমি ভিন্ন ধর্মের তো। তোর আব্বুকে বলবি, আমরা একই দেশের মানুষ, একই জ্যোৎস্না দেখি, একই বৃষ্টিতে ভিজি।
– এসব বললে, কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবেন।
নিখিল, আয়েশাকে হাসানোর চেষ্টা করে।
বাবলু স্যার এর একটা নতুন নাম দিয়েছি, আজ থেকে উনাকে ডাকবি, ‘হাবলু’ স্যার।
নিখিলের দেওয়া নাম জনপ্রিয় হয়, ক্লাসের সবাই গুঞ্জন শুরু করলো- বাবলু- হাবলু

স্কুলে দুর্গা পূজার ছুটি। চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ। এখন মধ্যরাত, ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া কোন শব্দ নেই। হুট করে নিখিলের চেঁচামেচিতে সবার ঘুম ভাঙ্গে। উঠোনে আসতেই সবাই নিখিলের কথা স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়, ‘চোর চোর, ঐ যে পালিয়ে গেলো’। আয়েশার বাবা ধড়ফড় করে এগিয়ে এসে খেয়াল করেন দেয়াল থেকে ঝাপ মেরে কেউ একটা পালিয়ে গেলো। ঘটনার আকস্মিকতায় উনি ঘামতে লাগলেন। আজই উনি দু লাখ ক্যাশ টাকা বাড়িতে এনেছেন পাওনাদারকে সকালে দেবেন বলে। আলমারির তালা চাবিও কয়েকদিন ধরে ঝামেলা করছে। চোর কোনভাবে ভেতরে ঢুকে ঘাপটি মেরে বসে থাকলে, সবার ঘুম গভীর হলে পরে সহজেই টাকা গাপ করতে পারতো। তিনি ভাবতেই শিউরে উঠছেন। উনি দেয়ালের উপর উঁকি দিয়ে নিখিলকে মৃদু হেসে বললেন-
– এতো রাতে জেগে আছ বাবা?
– আঙ্কেল রাতে একটু বেশী পানি খেয়ে ফেলেছিলাম।
আয়েশার বাবা শব্দ করে হেসে ফেলেন। জীবনে প্রথম তিনি এই পরিবারের কারো সঙ্গে সহজ হয়ে কথা বললেন। আয়েশা বলল-
– দন্যবাদ।
– ধুর! তুই মহাপ্রাণ অক্ষর উচ্চারণ করতে উলটপালট করিস। ‘’ কে ‘ক’ বলিস, ‘’ কে ‘দ’ বলিস। ‘ধন্যবাদ’ না বলে বলছিস দন্যবাদ।
সবাই হাসে। কিছু একটা মনে পরেছে এমন ভঙ্গীতে নিখিল বলে-
– পুজোয় এবার বাড়িতে কয়েক পদের নাড়ু হয়েছে আয়েশা, তোকে এক ডিব্বা দিবো।
– এক ডিব্বা!

আয়েশা হুট করে কাঁচুমাচু করে উঠে। বাবা মনে হয় কড়া মার দেবেন আজ। কিন্তু আয়েশার বাবা সবাইকে চমকে দিয়ে বলেন-
আমার জন্য আলাদা এক ডিব্বা দিও তো বাবা! গুড়ের নাড়ু আমার বেশ লাগে।

⊂…⊃

 modinarime@gmail.com,

Taylors University, Malaysia.

 

এইচ আই,চবি।

https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/09/textgram_1504906313.png?fit=1024%2C1024https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/09/textgram_1504906313.png?resize=150%2C150Top NewsBlogStoryআদার্সএক্সক্লুসিভগল্পধর্মফিচারবিনোদনব্লগসাহিত্যছোটগল্প - নিখিল মদিনা জাহান রিমি       বিজ্ঞান ক্লাসে আজ ভাইভা পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শেষে একই ক্লাসের দুই প্রতিবেশী বন্ধু, আয়েশা এবং নিখিল হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। আয়েশা বলল- - স্যার ভাইভাতে কি ধরল? - চেয়ারের হাতল। আর উনার হাতে একটা কলমও ধরা ছিল! আয়েশা হাঁটা থামিয়ে দেয়। বলে- - ফাইজলামি করিস নাতো, তোকে কি প্রশ্ন...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University