(১)
বছর দুয়েক আগের কথা। আমার তখন খুব বাজে সময় যাচ্ছিলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সবুজ-ঘেরা কাটা পাহাড় পথটুকু অতিক্রম করছিলাম। মাথায় রাজ্যের চিন্তা। প্রেম ছিলো কিনা জানিনা,গভীর বন্ধুত্ব বলে চালিয়ে দিতে পারি। সেই বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যাওয়ার দরুন আমি ভীষন আহত। কেবল মনো হতো সর্ম্পকটুকু যে করে হোক ধরে রাখা চাই। কিন্তু জোর দবস্তি আর অনিয়মের এই পৃথিবীতে আমি কেবল বন্ধুত্বের অধিকার নিয়ে কারো সামনে দাড়াতে পারিনা। অথচ দাড়ালে মেয়েটি আমার পক্ষে সাফাই গাইতো। কিন্তু আমার ছিলো সব মেনে নেবার অভ্যাস। আমিবিহীন অন্য কারো মাঝে সে যদি ভালো বন্ধুত্ব গড়ে নেয়,খারাপ কি। ছেড়ে দিলাম কাউকে নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার।

রাস্তার পাশেই ছাউনি। ছাউনির নিচে শীতল পাটি বিছিয়ে এক বই বিক্রেতা সাজিয়েছে বইয়ের পসরা। ক্লান্ত পা দুটো ভাজ করে তার পাশে বসলাম ।আমি জম্ম থেকে কবিতাপ্রেমী। কবিতার বই টেনে নিলাম তাই অগ্যতা। বইটির প্রথম কবিতা পড়ে আমার বুকের ভেতর অন্যরকম এক শিহরন খেলে গেলো। কী অদ্ভুত, পৃথিবীতে একই অনুভূতিতে আমার মতো ব্যাথিত আরো কেউ আছেন! আমার কেবল মনে হলো কবি আমাকে ভেবেই লিখেছেন তার নামকবিতা। সেইতো সার্থক সাহিত্যিক,যার লেখা পড়ে পাঠকের মনে হয় আরেহ এতো আমার জীবন,আমার কথা ,এতো স্বয়ং আমি ।

“আমার যেরকম প্রস্তুতি ছিল
তাতে অন্ততপক্ষে কয়েক রাউন্ড লড়ে যাওয়া যেতো
কিন্তু শৈশব থেকেই ছিল দাবী ছেড়ে দেওয়ার অভ্যেস
ফলে কখনই হস্তগত হয়নি মাছের মুড়ো ।
ছোট ছোট বস্তুগ ত্যাগ হাড়ে মজ্জায় ঢুকে কখন
যে বিপুল সব ইস্যু হয়ে গেছে টের পাই নি ।
বহুকাল পর আজ ভাবি পুশকিন পড়ে –
গুলি নয় একটা ঘুষি যদি অন্তত বাগানো শেখা যেতো
তাহলে সুস্পষ্টত দিবালোকে দাড়িয়ে বলতে পারতাম
এই মা টি যেমন আমার,
এই দেশটি যেমন আমার,
ঠিক তেমনি এ রমণীটিও আমার হয়।

শিখতে পারি নি ,তাই ডুয়েল না লড়েও
বিজয়কাহিনী লিপিবদ্ধ করে গেছে এক নিধিরাম সর্দার ।”
-আমার যেরকম প্রস্তুতি

বলছিলাম কবি ও লেখক মহীবুল আজিজ স্যারের কাব্যগ্রন্থ “আমার যেরকম প্রস্তুতি”র কথা। ব্যক্তিক জীবনের সহজ সরল শৈশবকে ফুটিয়ে তুলেছেন সাবলীলভাবে। মানুষের প্রতি,শত্রুর প্রতি নুন্যতম ঘুষি বাগানো শিখেননি তিনি। নামকবিতার এমন আশ্চার্য সুন্দর ভাব উপস্থাপন যেকোন পাঠককে ধরে রাখবে পুরো বইটি এক নিঃশেষে পড়ার জন্য।

(২)
তাঁর বেশ কিছু কবিতায় ফুটে এসেছে কথাসাহিত্যিকের স্বকীয়তা। গদ্যছন্দে রচিত প্রায় সবগুলো কবিতায় তিনি রেখেছেন ব্যক্তিগত দর্শন। সাহিত্য আড্ডাগুলোতে আমরা প্রায় সময় বলে থাকি কবিরা যদি গল্প উপন্যাস রচন করেন তা অন্যদের চেয়ে উতকৃষ্ট মানের হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কেনোনা তারাই ভালো জানেন একটি আবেগময়ী জীবনের গল্পকে গুটিকয়েক শব্দ-লাইনে মনোমুগ্ধকরভাবে কিভাবে তুলে ধরতে হয়। আমাদের সাহিত্যিক মহীবুল আজিজ স্যার তার অধিকাংশ কবিতায় এটি খাটিয়েছেন খুব কৌশলে। “সব তোমার নিয়মে” চলবে কিনা কবিতায় উল্লেখিত ‘তোমাকে’ বিভিন্ন দৃষ্টিকোন বোঝাতে বোঝাতে বলে উঠেন–
“সবচেয়ে ক্ষমতাবান লোক সবচেয়ে নিঃসঙ্গ হয় জেনো”

‘দীর্ঘকাল প্রতিক্ষায় দাড়িয়ে’ সকলের পা ব্যাথা হয়ে যায় জানি ।কিন্তু কবির এই দীর্ঘতম অপেক্ষায় পায়ের বদলে ব্যাধিগ্রস্থ হয়ে পড়ে তার হাত ও মন। এই দীর্ঘকাল অপেক্ষার সময়ে তিনি অনেক কিছু দেখেন ও শোনেন ।কেবল শোনেন নি “তোমার” ডাক। এই হাহাকারময় দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেক পর্যালোচনায় তিনি লেখেন-
“মানুষের ছায়া অন্ধকারে প্রায় দেহের সমান ই থাকে”

আলো আধারস্থ এক পর্যায়ে মানুষের ছায়া সমান হতেই পারে। কিন্তু অন্ধকারে কি কখনো কারো ছায়া দেখা যায়? কতটুকু গভীর নিশ্ছিদ্র অপেক্ষায় মানুষ আবিষ্কার করে অন্ধকার ছায়ার নিশ্চিত পরিমাপ?

(৩)
জীবনবাদী কবি মহীবুল আজিজ তার অধিকাংশ কবিতায় বাস্তববতার নানা চিত্র তুলে ধরেছেন সুনিপুনভাবে। সংকুল জীবনে কতটুকু সতর্ক হয়ে চলতে হয় তা তুলে ধরেছেন নিম্নোক্ত পঙতিতে –

“নরম গোলাপও জানে কাটা সাজাতে হয় রক্ষনভাগে
গোলাপের দূর্বলতাটুকু গোলাপই ভালো জানে”
-(সিংহীও প্রসব বেদনায় ভোগে)

প্রতিটি মানুষের ভেতরেই বসবাস করে অদ্ভুত এক মন। আবেগে পরিপূর্ন মনগুলো প্রায় পরোপকার ও বাস্তববাদীতার সংস্পর্শে তৈরী হলেও কিছু ক্ষেত্রে তার ভিন্ন ঘটে। আর তাইতো বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোন কোন পরোপকার মন কেবল কাটায় নিঃসঙ্গ জীবন।কবির পরোপকারী মনের চিত্রপট ভেসে উঠে তার কবিতায়-

‘প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একটি নিজস্ব নদী আছে
আবার এমনও লোক আছে যে সে নদীতে একটি একাকি
নৌকা ভাসিয়ে নিজেই যাত্রী ও পারানী হয়ে ভেসে চলে’
-(প্রত্যেক মানুষের ভেতরে)

(৪)
জাতিস্বত্তা,ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করার সাহস সাহিত্য রাখেনা। এইগুলোর সমন্বয়ীক মিলনেই সাহিত্য ও সাহিত্যবোদ্ধারা এগিয়ে চলে স্বাধীনভাবে। আর তাইতো ইতিহাস ও ঐতিহাসিক বিষয়ক সচেতন কবি মহীবুল আজিজ তার উল্লেখিত গ্রন্থের বিভিন্ন কবিতায় কখনো ষ্পষ্টকারে কখনো খুব সুকৌশলে তুলে ধরেছেন জাতিসত্ত্বা ও সংস্কৃতির ধারক বাহকদের ।

“বিউগলে বেজে উঠে অপূর্ব লালনগীতি
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে”
-(লালনের কী সৌভাগ্য)

আবার,একই কাব্যগ্রন্থের অন্য আরেক কবিতায়-

“…….অস্ত্রেশস্ত্রে লোকবলে যতই
যোদ্ধা বলে পরিচয় দিকনা কেন
তাদের অন্ধকারেই আসতে হয় ইতিহাসের
কোন এক পনেরো তারিখে”
-(অন্ধকারে)

(৫)
“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রুপ
খুজিতে যাইনা আর: অন্ধকারে জেগে উঠে মন্ডপের কাছে
চেয়ে দেখি ভূতের মতন ধূলি-কালি-ভস্ম মেখে বসে আছে
প্রতিবেশী বিষ্ণু শীল………..”
-(বাংলার মুখ)

কবিতাটি পড়েই ঘোরের মধ্যেই আমরা চলে যেতে থাকি কবি জীবনানন্দ দাশের কাছে। অথচ জীবনবাবুকে ভর করে কবি স্বয়ং সেখানে প্রতিবেশী বিষ্ণু শীলের জলজ্যান্ত পরিস্থিতি তুলে ধরে পাঠককে দিয়েছেন কবিতার ভিন্ন স্বাধ ।

হুটহাট করে ভিন্ন স্বাধ দেওয়ার মতো প্রবনতা কবি তার ব্যাক্তিক সত্ত্বায় লালন করেন। বোধহয় এই কারনেই “আমার যেরকম প্রস্তুতি” কাব্যগ্রন্থের ৪০টি কবিতার মধ্যে মাত্র একটি সনেট জাতীয় কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কাব্যগ্রন্থের ৩৯ তম কবিতা “কত কাব্য লিখতে চাই” লেখা হয়েছে চর্তুদশপদী নিয়মে।কবির নিজস্ব ভাষায়–

“শক্তি দেখানোই আমি ঠুটো জগন্নাথ
অক্ষমতার সনেটে পারঙ্গম হাত”
-(কতকাব্য লিখতে চাই)

(৬)
মরে গেলে মানুষের মূলত কি হয়? লাভ না ক্ষতি? সবচেয়ে জরুরী জীবনটি চলে গেলেও পৃথিবী চলে তার আপন নিয়মে। নিজের মৃত্যু নিয়ে সকল কবি সাহিত্যিক কিছু না কিছু ভাববাদী লেখা লিখে থাকেন। আমরা দূর্বল পাঠকেরা তা পড়ে অনুভব করি বুকের ভেতর হাহাকার। সাহিত্যিকগন কেনো শুধু তাদের নিজেদের বেলায় এতোটা হাহাকার তুলে দেন। নাকি আমরাই তাদের হারানোর কথা ভেবে অগ্রিম হাহাকারে ভুগি?

“এতোসব হৈ চৈ,কোলাহল,ভীড়,নির্জনতা সব থেকে যাবে
আমিই ক্রমশ মাটি থেকে আরো মাটি হয়ে যাবো”
-(আমার মৃত্যুর পরে)

(৭)
“কিন্তু তোমার যাওয়াটা স্পষ্ট জ্ঞানত হৃদয়ঙ্গম করতে পারছি
কারন দেখতে পাচ্ছি যে তুমি চলে যাচ্ছো”
-(তুমি এসেছিলে)

স্পষ্টত চলে যাওয়ার মত দৃশ্য সেবারই আমার প্রথম ছিলো।পাঠক,বলছিলাম নিজের বন্ধুত্বের কথা। আমার সেই বন্ধুটি যেদিন চলে যাবে হাতের কাছে কিছু না পেয়ে কপালের লাল টিপ খুলে আমাকে দিতে দিতে বললো- “স্মৃতি ভেবে রেখে দিও”। বুকপকেটে আজতক সেই স্মৃতি নিয়ে বেড়াই। শহরে আমার মত স্মৃতিকাতর ভবঘুরে আছে কিনা পাঠক নিচের পংকতি পড়েই বুঝে নিননা। মস্তিষ্কের মনিকৌটায় এইরকম স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে অহরহ মানুষ।

“একটি গোলাপ তুমি আমাকে দিয়েছিলে
দিয়ে বলেছিলে-যাই,আর এসোনা”
-(একটি গোলাপ তুমি আমাকে)

সার্থক সাহিত্যিকের মতো স্যার মহীবুল আজিজ তরুনদের মনের অব্যক্ত কথাগুলো বারবার ফুটিয়ে তুলেছেন। এইসব কবিতাই আমাদের জানান দেয় আমরা একা নই।ছোটখাট রোগের মতো এইসব রোগ জীবনে এক দুবার এসে ঢাক্কা দিয়ে যাবেই। আজকাল প্রায় বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় স্যারের লেখা পড়ি।সাহ্যিত্যিক বন্ধুদের সাথে লেনদেন হয় স্যারের বই।
নিভৃতচারী এই মানুষটির সাথে আজতক দেখা হয়ে উঠেনি ।অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক আমরা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে একরকম দূরত্ব থাকেই ।অনিয়মিত ক্লাসের দরুন সাহিত্যবোদ্ধা এই মানুষটির পদস্পর্শ থেকে দূরে। বাংলা সাহিত্যকে যিনি খুব গোপনে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন,তার পা ছুঁয়ে একবার আর্শীবাদ নেওয়ার ইচ্ছে পোষন করতেই পারি।

হৃদয় ইসমাইল
লেখা প্রকাশকালঃ
ফেব্রুয়ারি ২০১৭.
মহীবুল আজিজ সংখ্যা,সম্পাদক-আলী প্রয়াস,তৃতীয় চোখ প্রকাশন।

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/08/FB_IMG_1501872163935-1.jpg?fit=320%2C494https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/08/FB_IMG_1501872163935-1.jpg?resize=150%2C150হৃদয় ইসমাইলStoryএক্সক্লুসিভগল্পফিচারব্যাক্তিত্বমতামতসাহিত্যহৃদয় ইসমাইল(১) বছর দুয়েক আগের কথা। আমার তখন খুব বাজে সময় যাচ্ছিলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সবুজ-ঘেরা কাটা পাহাড় পথটুকু অতিক্রম করছিলাম। মাথায় রাজ্যের চিন্তা। প্রেম ছিলো কিনা জানিনা,গভীর বন্ধুত্ব বলে চালিয়ে দিতে পারি। সেই বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যাওয়ার দরুন আমি ভীষন আহত। কেবল মনো হতো সর্ম্পকটুকু যে করে হোক ধরে রাখা চাই।...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University