চাকরীর বাজারে যা কিছু চাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আমাদের সেভাবে বেড়ে ওঠা উচিত।আমাদের কোন কমতি থাকবে না।আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বের হবো। আমরা একসাথে বসলে কথাগুলো প্রায় শুনতাম নীলার মুখে।নীলা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের বেস্টফ্রেন্ডের মধ্যে একজন। শহুরে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সাদাসিধে একটি মেয়ে।ফর্সা ,গোলগাল চেহারা,চেহারাটা হিজাবে মোড়ানো থাকত সবসময়।অমায়িক আচরণ,চলাফেরা,পোশাক-আষাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর দশটা মেয়েদের থেকে আলাদা সে।বাইর থেকে দেখলে তাকে যতটা রক্ষণশীল মনে হয় ভেতর থেকে সে তত বেশি মডার্ণ,স্মার্ট ছিল।নীলাকে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম আসলে মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য কাছে বাইরের সৌন্দর্য কিছুই না।

আমি,রাহাত আর নীলা আমরা তিন জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কথা বলত সে।একবার কথা বলা শুরু করলে তাকে আর থামানো যেত না।চট্টগ্রামে একটা কথা আছে যারা নাকি মুরগির পাচা (চট্টগ্রামের ভাষায় খোরার পুদুরি)খায় তারাই বেশি কথা বলে ,এই বলে ক্ষেপাতাম আমরা তাকে। ধীরে ধীরে আমার গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে নীলা।আসলে আমি তাকে বুঝতে চাইতাম। তাকে বুঝা মুশকিল ছিল,এক এক সময় এক এক রকম মনে হতো।তখন একটা বিষয় বুঝতে পারলাম পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের অল্প সময়ে বোঝার চেষ্টা করলে মাথা হ্যাং হয়ে যায়,তাদেরকে বুঝতে হয় সময় নিয়ে ধীরে ধীরে।মাঝে মাঝে সময়কেও সময় দিতে হয়।নীলা তাদের মধ্যে একজন।আর বনুধুত্বটা শুরু হয় অনেক পরে যখন একে অপরকে বুঝতে শিখে যায়,এর আগে যেটা হয় তা শুধু পরিচিতিপর্ব,বন্ধুত্ব না।

আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে সে আমাদের বিভিন্ন স্বপ্নের কথা বলত,কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি,কখনো বিশ্বব্যাংকের এডি,কখনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর সিইও,কখনো বা বিসিএস ক্যাডার।আসলে সত্যি বলতে কি আমি আর রাহাত তার কাছে স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। সে প্রায় বলত আমি জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত এক এক করে উপভোগ করতে চায়।আমি নিজের পায়ে নিজে দাড়াতে চায়,যেখানে আমার প্রতি সম্মান থাকবে,আমার মতামতকে সম্মান করা হবে।

এভাবে পাঁচবছর কেটে যায়,এম বি এ তে গিয়ে আর নীলাকে বন্ধু হিসেবে পাইনি। আজ এমবিএ শেষ করেছি দু-মাস। আজ আমরা তিনজনই মুখোমুখি ,মুখোমুখি একে অপরের হাজার প্রশ্ন। টেবিলের ওপাশে নীলা আর এ পাশে আমি আর রাহাত ।টেবিলে তিন কাপ চা,আমারটাতে দুধ আর চিনি কম।আমার চায়ে দুধ চিনি কম হয় এটা নিয়ে একসময় খুব মজা করত নীলা। রাহাত ব্যাপারটা তুলতে গিয়ে নীলার আগ্রহ না দেখে চুপসে গেল।ঘনঘন ট্রেনের সাইরেন,১.৩০, ২.৩০ ,৩.০০ পেরিয়ে এখন ৪.৩০ ট্রেন যাচ্ছে।তবুও আজ আমাদের কোন তাড়া নেই।একসময় ট্রেনের জানালার পাশের সিটটার জন্য কত কাহিনী না করতাম আমরা।ট্রেনের সিট আমি ধরি কিংবা রাহাত জানালার পাশের সিটটা নীলার লাগবেই। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে।নীলা চুপচাপ ।বৃষ্টিতে আধভেজা অচেনা মানুষগুলোর বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা দেখতে বেশ ভালোয় লাগছে।মানুষগুলো বড্ড অচেনা।নীলাও সেদিকে তাকিয়ে আছে। নীলার মুখোমুখি হয়ে তার কথা গুলো একনাগাড়ে কানে বেজে চলেছে।তার সাথে বসে আছি প্রায় তিন ঘন্টা।এখন তার মুখে আর কোন স্বপ্নের গল্প নেই,নেই আর সৈই আকাশ ছুঁয়ার স্বপ্ন।

 

আজ সে পূর্ণ সংসারী ,সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল পরিবারের গৃহবধু,একসন্তানের মা। চতুর্থ বর্ষের মাঝামাঝি নীলার বিয়ে হয়,বিয়েতে নীলার মত ছিল না।পরিবারের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয় সে।ছেলে ব্যবসায়ী ,ভাল পয়সাওয়ালা।চট্টগ্রাম শহরে নিজস্ব বাড়ি কম কিসের?তাছাড়া বুড়াবুড়িরা বলেন মেয়েদের বয়স হলে বিয়ে হয় না।মেয়েদের যত তাড়াতাড়ি বিয়ে হয় তত ভালো।বিয়ের সময় কথা হয়েছিল,বিয়ের পর পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।বিয়ের পর পড়াশোনা আর হয় নি,আর চাকরী?বাড়ির বউয়ের চাকরী তার শুশুর বাড়ির বংশ ঐতিয্যের সাথে বেমানান।স্বামী তো আয় করছে স্ত্রী না হয় ঘর সামলাল। নীলা চুপচাপ।আজ আমাদের সামনে বসে থাকা নীলা আমাদের কাছে বড্ড অপরিচিত।সৈই খুনসুটি,অনর্গল কথা বলা কোনটাই আর নীলার মধ্যে নেই।আমাদের নীলা মরে গেছে,যেদিন তার স্বপ্ন থেকে তাকে আলাদা করা হয়েছে। মরে গেছে? নাকি খুন করা হয়েছে? এ ভাবে কত মেয়ের স্বপ্নকে আমরা গলা টিপে হত্যা করে চলেছি তার কোন হিসেব নাই।শুধু একটা কারণে সে “মেয়ে”।এজন্য দায়ী শুধুমাত্র আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ।

 

সামি আহসান

চট্টগাম বিশ্ববিদ্যালয়

https://i0.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/06/cu-campus.jpg?fit=1024%2C401https://i2.wp.com/culive24.com/wp-content/uploads/2017/06/cu-campus.jpg?resize=150%2C150culiveআইটিক্যারিয়ারমিডিয়াশিক্ষাবিশ্ববিদ্যালয় জীবনচাকরীর বাজারে যা কিছু চাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আমাদের সেভাবে বেড়ে ওঠা উচিত।আমাদের কোন কমতি থাকবে না।আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে বের হবো। আমরা একসাথে বসলে কথাগুলো প্রায় শুনতাম নীলার মুখে।নীলা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের বেস্টফ্রেন্ডের মধ্যে একজন। শহুরে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব সাদাসিধে একটি মেয়ে।ফর্সা ,গোলগাল চেহারা,চেহারাটা...Think + and get inspired | Priority for Success and Positive Info of Chittagong University